কর্পোরেটকে ঘৃণার সংস্কৃতি – এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ এবং কর্পোরেট না থাকলে কি সভ্যতার চাকা ঘুরতো?

আমাদের অনেকেই কিছু শব্দ আওড়াতে বেশ পছন্দ করি – সামাজিক অবক্ষয়, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, পুঁজিবাদ-সামন্তবাদ-সাম্রাজ্যবাদ, পশ্চিমা বিশ্বের ষড়যন্ত্র, বস্তুবাদ, পরজীবি বুদ্ধিজীবি ইত্যাদি ইত্যাদি। ইদানিং এর সাথে যোগ হয়েছে কর্পোরেট থাবা, কর্পোরেট দখল, কর্পোরেট লোভ বা এই জাতীয় কিছু শব্দ। মোট কথা বড় কম্পানীগুলোর ব্যবসা-বানিজ্যের ধরণের বিরুদ্ধে এক ধরণের ঘৃণা বা অপছন্দতা। দেশে বড় কিছু ঘটলেই যেমন কিছু মানুষ অবধারিতভাবে ধরে নেয় এটা ইন্দো-মার্কিন-ইজরায়েল এর চক্রান্ত, তেমনি দেশের বড় বড় কম্পানীগুলো তাদের মুনাফা বৃদ্ধির জন্য কোন নতুন কিছু করলেই গেলো গেলো রব উঠে যায়। ভাবখানা এমন এই কম্পানীগুলোর সিইও হচ্ছে স্বয়ং ইবলিশ শয়তান আর তাদের জীবনের লক্ষ্য হচ্ছে আমাদের এই গরীব দেশটাকে চুষে নিঃশেষিত করে দেওয়া।

কর্পোরেট বলতে আমরা সাধারণত বড় কম্পানীগুলোকেই বুঝাই। এগুলোর অনেকগুলোই আবার বহুজাতিক কম্পানী। কর্পোরেট এর প্রতি আমাদের ঘৃণা যতোই হোক না কেনো, আমাদের একটা মুহুর্তও কর্পোরেট এর উৎপাদিত পণ্য ছাড়া চলবেনা। আঠারো শতকের দিকে যে শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিলো ইউরোপে, আজকের কর্পোরেট তারই বিশ শতকীয় সংস্করণ। এই যে আমি যেই কম্পিউটার ব্যবহার করে এই লেখাটি লিখছি সেটি ডেল নামক বহুজাতিক কম্পানীর তৈরি, ইন্টারনেট কানেকশন নেওয়া হয়েছে আরেক বিশাল কম্পানী কমকাস্ট থেকে, আমার ঘরের প্রায় প্রত্যেকটি জিনিসপত্র কোনো না কোনো কম্পানীর তৈরি। পানি, বাতাস, আর মাটি ছাড়া বেঁচে থাকার জন্য যা যা দরকার তার সবই আসে কর্পোরেট থেকে। আমার নিজের চাকুরীটাও একটা বহুজাতিক কম্পানীতে! এবং এ চাকুরী পেয়ে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি! এবং সেটাই কি আমাদের সবার জন্য সত্যি নয়? আমাদের সবাই কি একটা ভালো কম্পানীতে একটা ভালো চাকুরী পেলে নিজেদের ধন্য মনে করি না?

পৃথিবীর সভ্যতার চাকা ঘুরানোর মূল রসদগুলো আবিষ্কার করেন বিজ্ঞানী, গণিতবিদ, অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী এঁরা। কিন্তু এগুলো পৃথিবীর ছয় বিলিয়নেরও বেশি মানুষের কাছে তাদের ব্যবহারের মতো পণ্য বা সেবা হিসেবে প্রস্তুত করে নিয়ে যায় মূলত বিভিন্ন বেসরকরারী প্রতিষ্ঠান এবং কম্পানীগুলো (কিছু ক্ষেত্রে সরকারও এই কাজটি করে থাকে)। কম্পানীগুলো এই কাজটি কোনো জনসেবার চিন্তা থেকে নয়, বরং পুরোপুরি মুনাফা লাভের উদ্দেশ্যে। কিন্তু এই মুনাফা লাভ করতে গিয়ে ওরা অসংখ্য মানুষকে চাকুরী দেয় আর মানুষের জীবনকে করে দেয় অনেক বেশি আরামদায়ক। এখন ওরা কতোটুকু লাভ করবে, কিংবা কী প্রক্রিয়ায় ব্যবসা করবে এই আইনগুলি ঠিক করে দিবে দেশের সরকার, যেই সরকারকে নির্বাচন করে ক্ষমতায় আনবে সেই দেশের জনগন। জনগন যেহেতু সরকারকে ক্ষমতায় আনবে, তাই সরকার এমনভাবে আইন করবে যাতে জনগনের স্বার্থ সবার আগে রক্ষা হয়। এক্ষেত্রে এটাও মনে রাখতে হবে যারা ওই কম্পানীগুলোর মালিক/অংশীদার তারাও এই জনগনের অংশ, এবং তারাও অসংখ্য মানুষের চাকুরীর ব্যবস্থা করে দেশের অর্থনৈতিক চাকাকে সচল রাখছে।

আমরা যারা বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়এ পড়ছি বা পড়ে পাশ করে বের হয়েছি, আমাদের সবার লক্ষ্য কী? প্রায় সবাই কি একটা ভালো চাকুরী করতে চাই না? বড় বড় টেলিকম কম্পানীগুলো, কিংবা বড় বড় বুহুজাতিক কম্পানী-ব্যাঙ্কগুলো হয় আমাদের প্রথম টার্গেট, কারণ সেগুলো সবচেয়ে বেশি বেতন দেয়। একটা স্বাভাবিক জীবন যাপনের জন্য সবারই টাকা দরকার হয়, টাকা নিয়ে যতোই বড় কথা বলি না কেনো আমরা। আর সেই টাকার একটা বড় অংশ অর্থনীতিতে পাম্প করে এই কম্পানীগুলো। অর্থনীতিকে সচল রাখতে কম্পানীগুলোর কোনো বিকল্প নেই।

উন্নত দেশগুলিতে এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপকে প্রচন্ড উৎসাহ দেওয়া হয়। বৈদ্যুতিক বাল্বসহ অসংখ্য আবিষ্কারের জনক থমাস আলভা এডিসন ছিলেন একজন সফল উদ্দোক্তা (এন্ট্রাপ্রেনিউর)। মাইক্রোসফট এর বিল গেটস, গুগলের ল্যারি এবং সের্গেই, এইচপি এর হিউলেট এবং প্যাকার্ড – এরকম অনেক কম্পানীর প্রতিষ্ঠাতারা আক্ষরিক অর্থেই জিনিয়াস পর্যায়ের মানুষ। এই কম্পানীগুলো বিংশ এবং একবিংশ শতকের সভ্যতার পরিবর্তনের অন্যতম চালক। তেমনি করে সারা পৃথিবী জুড়ে খেলাধুলা, ইলেক্ট্রনিক্স, কম্পিউটার, টেলিকম, পেট্রোলিয়াম, কসমেটিক্স, খাদ্যদ্রব্য, যানবাহন, উড়োজাহাজ, স্বাস্থ্য – ইত্যাদি বিভিন্ন খাতে অসংখ্য শিল্প প্রতিষ্ঠান নির্ভর কম্পানী নানারকম পন্য এবং সেবা দিয়ে পৃথিবীতে আমাদের জীবন যাপনকে করে দিয়েছে অনেক বেশি সুবিধাজনক আর আরামদায়ক। আমাদের আজকের এই মোবাইল ফোন বিপ্লব, মিডিয়া বিপ্লব এগুলোর পেছনেও রয়েছে কর্পোরেট। মোবাইল ফোন ছাড়া কি একটা দিনও থাকার কথা ভাবা যায়? আর কর্পোরেটকে বাদ দিয়ে সরকারীভাবে ফোন সেবা দিতে চাইলে যে কী অবস্থা হয় সেটা টিএন্ডটি আর টেলিটককে দেখলেই বুঝা যায়!

দেশের অর্থনীতির স্বাস্থ্য অনেকাংশেই নির্ভর করে এই কম্পানীগুলোর স্বাস্থের উপর। কম্পানীগুলোর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে টাকা কামানো, সরকার সঠিক আইনের মাধ্যমে এই কম্পানীগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখবে। কম্পানীগুলোকে ঘৃণা করে দেশের অর্থনীতির উন্নয়ন ঘটানো যাবে না। দুঃখের বিষয় এমনকি বিয়ে করার সময় পাত্র ব্যবসা করে এমন কথা শুনলে আমাদের অভিভাবকরা তাদের মেয়ে বিয়ে দিতে চায়না অনেক সময় সেই পাত্রের কাছে। ব্যবসা মানেই মুদির দোকানী বা এরকম কিছু, কিংবা ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হতে না পেরে কিছু একটা করার চেষ্টা – এই ধারণা থেকে আমাদের বের হতে হবে। মেধাবী ছেলেমেয়েরাও ব্যবসা করে, এবং সেই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অনেক মেধাবী ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-ব্যবসা প্রশাসন গ্র্যাজুএট কাজ করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে – এটাকে একটা বাস্তবতা হিসেবে আমাদের মেনে নিতে হবে।

আমাদের দরকার অনেক অনেক ব্যবসায়ী উদ্দোক্তা, অনেক অনেক কর্পোরেট কম্পানী। সিলিকন ভ্যালীর মতো সভ্যতা পরিবর্তনকারী ব্যবসা’র জায়গা তৈরী হয়েছে শুধুমাত্র উদ্দোক্তাদের মাধ্যমে। সিলিকন ভ্যালীর উদ্দোক্তারা প্রায় সবাই কোটিপতি, কিন্তু তাদের পন্য ব্যবহার করে আরো বেশি মানুষ কোটিপতি হয়েছে এবং তার চেয়েও বেশি মানুষ আরামদায়ক জীবন যাপন করছে তাদের প্রযুক্তি ব্যবহার করে। “কর্পোরেট” শব্দটাকে একটা ভালো শব্দ হিসেবে দেখতে হবে। কর্পোরেটএ চাকুরী পাবার জন্য একের পর সিভি জমা দিবো কিন্তু ব্লগে বসে কর্পোরেটকে গালি দিবো সেটা হওয়া উচিত নয়। এরচেয়ে গণহারে সমালোচনা না করে স্পেসিফিক সমালোচনা করলে ব্যাপারটা অনেক বেশি ঠিক হয়। কর্পোরেট যেনো আমেরিকার মতো হয়ে না পড়ে – আমেরিকাকে সবাই গালি দেয় কিন্তু সবাই সেখানে যেতে চায়, ডিভি লটারিতে সবচেয়ে বেশি আবেদন পড়ে বাংলাদেশ থেকে! কর্পোরেট যেনো একটা আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়, এন্ট্রাপ্রেনিউর হওয়া ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-ম্যানেজার হওয়ার চেয়ে কম স্মার্ট ব্যাপার না। একটি সফল পণ্য তৈরি ও বাজারজাত করা এবং সেটিকে সবার নিত্যদিনের ব্যবহার্য করে তোলা একটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার, এবং এই কাজের জন্য দরকার ভিশন এবং এক্সিকিউশন। আজকের দিনের সেরা ব্র্যান্ডগুলি তৈরির পেছনে অসংখ্য প্রতিভাবান মানুষের অনেক বছরের পরিকল্পনা আর পরিশ্রম রয়েছে। এই পরিশ্রমকে খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই।

তবে কর্পোরেট যেনো মানুষের ক্ষতির কারণ না হয়ে দাঁড়ায় তার জন্য থাকতে হবে শক্ত আইন এবং তার শক্ত প্রয়োগ। বন উজাড় করে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, চাষাবাদের জমি এবং নদী দখল করে আবাসিক প্রকল্প গড়ে তোলা, সেবার তুলনায় টাকা বেশি নেওয়া ইত্যাদি ব্যাপারে সরকারকে থাকতে হবে তৎপর। কিন্তু এসব যাতে কর্পোরেট এর বিরুদ্ধে নির্বিচার ঘৃণার কারণ না হয়ে উঠে সেটি খেয়াল রাখতে হবে। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে কর্পোরেট এর বিকল্প নেই। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে বছর বছর যে হাজার হাজার ছেলেমেয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং, বিবিএ, অর্থনীতি, রাজনীতি বিজ্ঞান, সমাজ বিজ্ঞান, ইত্যাদি অসংখ্য বিষয় থেকে পাশ করে বের হচ্ছে তাদের পর্যাপ্ত চাকুরীর জন্য দরকার অনেক অনেক কর্পোরেট কম্পানী। শুধু খেয়াল রাখতে হবে আমাদের সরকার যেনো দেশের আইনটা ঠিকমতো প্রয়োগ করে আর সাধারণ মানুষের স্বার্থের দিকটা ঠিক রাখে।

মাইক্রোসফট এর সাতকাহন – পর্ব ১ (ইন্টার্ণশীপ ইন্টারভিউ)

ওহাইও স্টেইট বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের ক্লাশ শুরু হয় ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। ক্লাস শুরুর সপ্তাহ দুএকের মধ্যে একদিন ইমেইল পেলাম যে আগামী মাসে (অক্টোবর) কোনো এক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্যারিয়ার ফেয়ার অনুষ্টিত হবে। আমেরিকার সব নামকরা কম্পানী সেখানে আসবে এবং তাদের কাছে সরাসরি সিভি (CV) জমা দেওয়া যাবে। কম্পিউটার বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে আমি খুঁজছিলাম কম্পিউটার জায়ান্ট কম্পানীগুলোকে। মেলাটি হচ্ছিলো বিশাল এলাকা জুড়ে, একশ’র বেশি স্টল ছিলো ওখানে। সবার সামনে পেলাম আইবিএম এর স্টল। সোজা গিয়ে বললাম আমি আইবিএমএ কাজ করতে আগ্রহীঃ-) ওরা বললো ওরা সি++ জানা লোক খুঁজছে, তাই আমি মনের আনন্দে আমার সিভি জমা দিলাম। এরপর আরো অনেক কম্পানী দেখলাম কিন্তু গুগল বা মাইক্রোসফটকে কোথাও দেখলাম না। হতাশ হয়ে ফিরে আসছিলাম। ফিরে আসার পথে একজনকে জিজ্ঞেস করলাম গুগল বা মাইক্রোসফট এই মেলায় এসেছে কিনা। সে বললো সে গুগলের কথা জানেনা কিন্তু মাইক্রোসফট এসেছে এবং তারা অমুক সারির অতো নাম্বার স্টলে আছে। আমি সাথে সাথে লোকটিকে ধন্যবাদ দিয়ে মাইক্রোসফটএর স্টল এর দিকে রওয়ানা দিলাম।

মাইক্রোসফট এর স্টল খুঁজে পেতে একটু সময় লাগলো। মাইক্রোসফট থেকে আসা কয়েকজন সেখানে ছিলো যারা সিভি ড্রপ করতে আসা বিভিন্ন ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে কথা বলছিলো। তো একসময় আমার পালা আসলো। ইন্ডিয়ান একটা ছেলে আমার দিকে এগিয়ে এসে হাত বাড়ালো। আমিও হাত বাড়িয়ে হাত মেলালাম। আমি তখনো ছাত্র, মাত্র আমার মাস্টার্স শুরু করেছি, বললাম আমি সামনের গ্রীষ্মের ছুটিতে মাইক্রোসফটএ ইন্টার্ণশীপ করতে আগ্রহী। সে আমার সিভিটি নিলো। ভালো করে দেখলো সেটি। এরপর আমার কিসে আগ্রহ, কী ধরণের কাজ ভালো পারি এসব জিজ্ঞেস করলো। আমিও আমার মতো করে উত্তর দিয়ে গেলাম। এরপর সে বললো সে আমার সিভি সঠিক জায়গায় পৌঁছে দিবে এবং আমার যোগ্যতার সাথে ম্যাচ করে এমন পজিশন খালি থাকলে আমার সাথে যোগাযোগ করবে। বিদায় নেবার সময় আমার হাতে একটা সুডকু (একধরণের পাজল গেইম) বই ধরিয়ে দিয়ে বললো – “তুমি যেহেতু প্রব্লেম সল্ভিং পছন্দ করো, তাই তোমাকে এই পাজল এর বইটি দিচ্ছি। আমার ধারণা তুমি এটা উপভোগ করবে”।

সেদিন ল্যাবে ফিরে এসে আমি মোটামুটি এই ক্যারিয়ার ফেয়ার এর কথা ভুলেই গেলাম। নতুন পরিবেশে পড়ালেখার চাপে আমার তখন ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা। এরমধ্যে একদিন ইমেইল পেলাম মাইক্রোসফট থেকে। “নভেমবর মাসের অমুক তারিখে আমাদের ক্যাম্পাস ইন্টারভিয়ার এর সাথে তোমার একটা ইন্টারভিউ এর ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমাদের জানাও তুমি সেসময় এটায় উপস্থিত থাকতে পারবে কিনা”। আমি মনে মনে বললাম, “আবার জিগায়!”। সাথে সাথে ইমেইল এর উত্তর দিলাম – “ধন্যবাদ আমাকে ইন্টারভিউএ আমন্ত্রণ জানানোর জন্য। আমি ওইদিন যথাসময়ে জায়গামতো উপস্থিত থাকবো”। এরপর ওরা জায়গা ও সময় কনফার্ম করে আরেকটা এমেইল দিয়েছিলো। আমি মনে মনে দিন গুনতে লাগলাম।

ইন্টারভিউ এর দিন ঘনিয়ে আসতে থাকায় আমি ইন্টারনেট ঘেঁটে প্রাথমিক ইন্টারভিউয়ে আসতে পারে এমন প্রশ্ন ডাউনলোড করে পড়া শুরু করলাম। টুকটাক প্রোগ্রাম লিখে ভুলে যাওয়া প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ এর সিনট্যাক্স ঝালাই করে নিলাম। ইন্টারভিউ এর জায়গাটি ছিলো আমাদের কম্পিউটার সায়েন্স বিজ্ঞান বিভাগের উলটা দিকের বিল্ডিং, তাই সেটি খুঁজে পাওয়া নিয়ে কোনো চিন্তা করতে হলো না। ইন্টারভিউ এর দিন আমি যথাসময়ে ইন্টারভিউ এর নির্ধারিত ভবনে যেয়ে পৌঁছালাম। ওখানে ডেস্কে থাকা মেয়েটিকে বললাম আমি কেনো এসেছি। ও কম্পিউটারে আমার নাম দেখে নিশ্চিত হয়ে নিয়ে আমাকে একটা ফর্ম ধরিয়ে দিলো। ফর্মটি পূরণ করে আমি সোফায় বসে অপেক্ষা করতে থাকলাম আমার ইন্টারভিউয়ার এর জন্য।

একসময় আমার ইন্টারভিউয়ার আসলো। লম্বা মতোন এক আমেরিকান ভদ্রলোক এসে হাত বাড়িয়ে আমার নাম জিজ্ঞেস করলো আর নিজের পরিচয় দিলো? ও জানালো ও ভিজুয়াল স্টুডিও গ্রুপ এর একজন ম্যানেজার। আমি ওকে অনুসরণ করে ছোট একটি কক্ষে প্রবেশ করলাম। এখানেই আমার ইন্টারভিউ হবে। ও আমার সিভি বের করলো। আমার সিভি দেখে আমাকে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলো। সিভিতে যেসব স্কিলস এর কথা লিখেছি ওগুলো নিয়ে কয়েক মিনিট আলোচনা করলো। এরপর আমাকে স্ট্রিং সম্পর্কিত একটা প্রোগ্রামিং সমস্যা সমাধান করতে বললো। আমি কাগজে সেটির কোড লিখলাম। আমার কোড নিয়ে আমাকে প্রশ্ন করলো। কিভাবে আমার এই কোড আমি ব্রেক করবো সেটা জিজ্ঞেস করলো। এই কোডকে টেস্ট করার জন্য টেস্ট কেইস লিখতে বললো। এরপর আরো কিছু টুকটাক প্রোগ্রামিং প্রশ্ন করে আমার ইন্টারভিউ শেষ করলো। শেষ করার আগে এখানে যা নিয়ম, আমাকে জিজ্ঞেস করলো আমার কোনো প্রশ্ন আছে কিনা তার জন্য। আমি প্রস্তুত ছিলাম। তাকে মাইক্রোসফট এর সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট নিয়ে দুএকটা প্রশ্ন করলাম। ও আমাকে সেগুলোর ব্যাখ্যা দিলো। এভাবে শেষ হলো সেদিনের ইন্টারভিউ পর্ব।

ইন্টারভিউ শেষে আবার আমার ব্যস্ত পড়ালেখার জীবনে ফিরে গেলাম। কিন্তু মনে মনে ভীষণ অপেক্ষা করতে থাকলাম একটা ইমেইল এর জন্য! ওরা যদি আমাকে পছন্দ করে থাকে তাহলে আমাকে ওরা মাইক্রোসফট এর প্রধান অফিস ওয়াশিংটন স্টেইট এর রেডমন্ড নামক শহরে নিয়ে যাবে একদিন সারাদিন ইন্টারভিউ এর জন্য। আমার ইন্টারভিউ মোটামুটি ভালোই হয়েছিলো, কিন্তু সবাই নিশ্চয়ই এখানে ভালো ইন্টারভিউ দেয়! সবাই বলছিলো সাধারণত দুই সপ্তাহের মধ্যে ওরা রেজাল্ট জানিয়ে দেয়, কিন্তু ২ সপ্তাহ চলে গেলেও ওদের ইমেইল এর কোনো দেখা মিললো না। এ পর্যায়ে আমি সব আশা ছেড়ে দিলাম। অবশেষে তিন সপ্তাহ পর আমাকে অবাক করে দিয়ে আমার মেইলবক্সে মাইক্রোসফট থেকে একটা ইমেইল আসলো যে আমাকে মাইক্রোসফট এর প্রধান কার্যালয়ে একদিন সারাদিন ইন্টারভিউ এর জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে। এই ইমেইল পেয়ে আমার খুশি আর দেখে কে। ইন্টার্ণশীপ না পাই, নিদেনপক্ষে মাইক্রোসফট এর খরচে ওদের প্রধান কার্যালয় দেখে ঘুরে তো আসা যাবে!

সামনে ক্রিসমাসের ছুটি থাকায় আমার ইন্টারভিউ ওরা ঠিক করে ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে। রেডমন্ড যাওয়া-আসার প্লেইন টিকেট, হোটেল এর বিল, থাকা-খাওয়া সবই মাইক্রোসফট বহন করবেঃ-) আমার ফ্লাইট এর দিন ঠিক করি ইন্টারভিউ এর আগেরদিন। কিন্তু ফ্লাইট এর দিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই ভয়েস মেইল পাই এয়ারলাইন্স থেকে যে মত্রারিরিক্ত তুষারপাতের ফলে আমার ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এর নামই মনে হয় কপাল। আরেকটু বেলা গড়ানোর পর আমি যোগাযোগ করি মাইক্রোসফটএ আমার রিক্রুটার এর সাথে। সে তখন একটু সময় নিয়ে দুই সপ্তাহ পর আমার ইন্টারভিউ এর দিন পুননির্ধারণ করে। আমার অনুরোধে ওরা আমেরিকার তুষারপাতপ্রবণ এলাকা (মিড-ওয়েস্ট এলাকা) এড়িয়ে অন্য শহরের মধ্য দিয়ে কানেক্টিং ফ্লাইট ঠিক করে দেয়।

সৌভাগ্যক্রমে আমার নতুন ইন্টারভিউ এর দিন কোনো ঝামেলা ছাড়াই সিয়াটল এয়ারপোর্ট এসে পৌঁছাই। সিয়াটল এয়ারপোর্ট থেকে ট্যাক্সি নিয়ে সোজা রেডমন্ডে আমার হোটলে চলে আসি। বিকেলে মাইক্রোসফট এর সাইদ ভাই আমাকে মাইক্রোসফট ক্যাম্পাস ঘুরিয়ে নিয়ে আসেন। মাইক্রোসফট ক্যাম্পাস একটা বিশাল এলাকা। একশ’র মতো বিল্ডিং আছে এখানে। উইন্ডোজ আর অফিস (ওয়ার্ড, এক্সেল, পাওয়ার পয়েন্ট ইত্যাদি) এর সবচেয়ে বড় দুটি প্রডাক্ট হলেও সার্চ, এমএসএন, এক্সবক্স, জুন মিউজিক প্লেয়ার, উইন্ডোজ সার্ভার, এসকিএল সার্ভার, ভিজুয়াল স্টুডিও – ইত্যাদি অসংখ্য গ্রুপ এর অফিস ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পুরো এলাকা জুড়ে। সে যাক, মাইক্রোসফট এর অফিস এবং সফটওয়্যার ব্যবসা নিয়ে আরেকদিন লিখবো। আজ আমার ইন্টারভিউ নিয়ে লেখা যাক।

তো পরদিন আমি সকাল দশটার সময় বিল্ডিং ১৯ এ চলে যাই। বিল্ডিং ১৯ হচ্ছে মাইক্রোসফট এর রিক্রুটিং বিল্ডিং। সকল নতুন চাকুরীপ্রার্থীকে সবার আগে এখানে চেকইন করতে হয়। তো রিসেপশনে যেয়ে নাম বলতেই আমাকে বলা হলো আমার রিক্রুটার একটু পরে এসেই আমাকে নিয়ে যাবে। আমি লবিতে সোফায় বসে অপেক্ষা করতে থাকলাম। একটু পরই আমার রিক্রুটার ডেভিড এসে নিজের পরিচয় দিলো এবং আমাকে নিয়ে ওর অফিসএ নিয়ে গেলো। সেখানে আমার নন-টেকনিকাল ইন্টারভিউ হলো। আমি কেনো মাইক্রোসফটএ কাজ করতে চাই, আর কোন কোন কম্পানীতে এপ্লাই করছি, আমার স্যালারি এক্সপেক্টেশন কেমন, কী ধরণের কাজ আমার পছন্দ এই সব। ঘন্টা খানেক ওর সাথে থেকে ও আমাকে আমার প্রথম টেকনিকাল ইন্টারভিউয়ার এর কাছে পাঠিয়ে দেয়। মাইক্রোসফটএ বিভিন্ন বিল্ডিং এর মধ্যে সারাক্ষণ অনেক শাটল কার চলাচল করে। ও আমাকে সেরকম একটা কারে করে বিল্ডিং ৪০ এ আমার প্রথম ইন্টারভিউয়ার এর কাছে পাঠিয়ে দেয়।

বর্ণনা অনেক লম্বা হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমার প্রথম ইন্টারভিউয়ার এর গল্প না বললেই নয়। যেহেতূ তখন লাঞ্চ এর সময় হয়ে গিয়েছেলো, তাই আমার প্রথম ইন্টারভিউটি ছিলো একটা লাঞ্চ ইন্টারভিউ। লাঞ্চ ইন্টারভিউ মানে হচ্ছে ইন্টারভিউয়ার চাকরীপ্রার্থীকে লাঞ্চএ নিয়ে যাবে এবং খাবার খেতে খেতে বিভিন্ন প্রশ্ন করবে। আমার প্রথম ইন্টারভিউয়ারের নাম ছিলো আ্যলেক্স। ও একজন চাইনিজ-আমেরিকান। গতো প্রায় বিশ-পঁচিশ বছর ধরে আমেরিকাতে আছে। তো ও আমাকে ক্যাফেটারিয়ার দিকে নিয়ে যেতে যেতে জিজ্ঞেস করলো আমার কী ধরণের খাবার পছন্দ। আমি মাছে ভাতে বাঙ্গালী। ওকে বললাম ঝাল মশলা দেওয়া ইন্ডিয়ান (বাংলাদেশী খাবার বললে ওরা চিনেনা, আমাদের টাইপের খাবারকে ওরা ইন্ডিয়ান খাবার বলে) খাবার আমি পছন্দ করি, আমেরিকান খাবার তখনো আমার মুখে রচে না। ও আমাকে অবাক করে দিয়ে বললো, “চলো আমার সাথে”। আমাকে নিয়ে সোজা পার্কিং গারাজে যেয়ে ওর বিশাল জীপ গাড়িতে উঠলো। এরপর আমাকে নিয়ে গেলো মায়ুরি নামের এক ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টএ! মায়ুরিতে ভাত আর মশলা দেওয়া মুরগীর তরকারী খেতে খেতে দিলাম আমার মাইক্রোসফট এর প্রথম ইন্টারভিউ!

এরপর একে একে আরো তিনটি ইন্টারভিউ দিই। প্রত্যেক ইন্টারভিউয়ার তার ইন্টারভিউ শেষ হওয়ার পর পরবর্তী ইন্টারভিউয়ার এর কাছে পাঠিয়ে দেয়। চার ইন্টারভিউয়ারের প্রথম দুইজন ছিলো উইন্ডোজ নেটওয়ার্কিং গ্রুপ এর, আর শেষের দুজন ছিলো উইন্ডোজ ফান্ডামেন্টালস গ্রুপ এর। শেষ ইন্টারভিউ নেন উইন্ডোজ গ্রুপ এর একজন ডিরেক্টর। তাঁর সাথে কথা বলার সময়ই মনে হয়েছিলো আমার ইন্টারভিউ মনে হয় খারাপ হয়নি। ইন্টারভিউ এর শেষে তিনি যে কথাগুলি বলেছিলেন সেটা এখনো আমার মনে আছে – “ঠিক আছে তুমি তোমার বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যাও আর মনযোগ দিয়ে লেখাপড়া করো। দেখি আমি তোমার জন্য কী করতে পারি”। তাঁর এ ধরণের কথা আমার কাছে খুব পজিটিভ মনে হয়েছিলো!

এর এক সপ্তাহ পরেই আমার সেমেস্টার ফাইনাল পরীক্ষা থাকায় আমি ওইদিন রাতেই ওহাইও ফিরে আসি। পরেরদিন সকালবেলা আমার দাঁতের ডাক্তার এর সাথে এপয়েন্টমেন্ট ছিলো। সকালে আমি আমার দাঁতের স্কেলিং করাচ্ছিলাম। আমার ফোন বন্ধ ছিলো। দাঁতের ক্লিনিক থেকে বের হয়ে মোবাইল অন করতেই দেখি একটা ভয়েস মেইল। মাইক্রোসফট থেকে আমার রিক্রুটার ডেভিড ফোন করেছে। ভয়েস মেইলএ ও জানালো আমার ইন্টারভিউ এর রেজাল্ট রেডি ওর কাছে, আমি যেনো ওকে কল ব্যাক করি। আমারতো তখন বুকের ভেতর ড্রামের বাড়ি হচ্ছে। আমি সাথে সাথেই ওকে কল করি। আর তখনি ও আমাকে আমার জীবনের সবচেয়ে ভালো খবরগুলির একটি জানালোঃ মাইক্রোসফট এর দুটি গ্রুপ – উইন্ডোজ ফান্ডামেন্টালস আর উইন্ডোজ নেটওয়ার্কিং – আমাকে সামনের সামারের জন্য একটি ইন্টার্ণশীপ অফার করছে!! গ্রুপ দুইটির ডিরেক্টর দুজন আমাকে ফোন করে তাঁদের গ্রুপ সম্পর্কে বলবেন, এরপর আমি যে গ্রুপ পছন্দ করি সেটিতেই জয়েন করতে পারবো।

এটা ছিলো আমার জীবনের একটা শ্রেষ্ঠ সময়। নেটওয়ার্কিং এর প্রতি আমার আগ্রহ থাকায় আমি নেটওয়ার্কিং গ্রুপকেই সিলেক্ট করি। অবশ্য ফান্ডামেন্টালস গ্রুপ আমাকে ঘুষ হিসেবে এক্সবক্স গেমস, ওয়েব ক্যাম, বিভিন্ন ধরণের মাক্রোসফট কম্পানী স্যুভেনীর পাঠিয়েছিলো ওদের গ্রুপ এর দিকে আকৃষ্ট করার জন্য! কিন্তু ঘুষ দিয়ে কি আর সবকিছু হয়ঃ-)

২০০৭ এর জুন মাসের ১২ তারিখে আমি মাইক্রোসফটএ উইন্ডোজ নেটওয়ার্কিং গ্রুপ এর ওয়েব ক্লায়েন্ট টিম (যারা http প্রটোকল implement করে) এর একজন ইন্টার্ণ হিসেবে জয়েন করি। শুরু হয় আরেক বিচিত্র আনন্দ যাত্রা। সে যাত্রার খবর আগামী পর্বে। এইবেলা এখানেই ইতি টানি!

ওয়াইল্ড ওয়াইল্ড ওয়েব – ইন্টারনেট প্রযুক্তি কোন দিকে যাচ্ছে?

আশি’র দশকের শেষের দিকে টিম বার্নার্স-লি যে ওয়েব (Web) নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন, সেই ওয়েব যে আজকে এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়াবে সেটা তিনি নিজেই ভেবেছিলেন কিনা সন্দেহ আছে। ওয়েব প্রযুক্তি দিনদিন সমৃদ্ধ হচ্ছে, আমাদের জীবনের যাবতীয় প্রয়োজন মেটানোর প্রায় সবকিছুই এখন ওয়েবএ পাওয়া যায়। মানুষের সাথে মানুষের এতো সহজ যোগা্যোগ এবং তথ্যের আদান-প্রদান পৃথিবীর ইতিহাসে আগে কখনো হয়নি।

আমরা অনেকেই ইন্টারনেট বলতে যা বুঝি সেটা হচ্ছে আসলে ওয়েব। ওয়েব হচ্ছে ইন্টারনেট এর অনেকগুলো আ্যপ্লিকেশন এর একটি। অন্যান্য আরো কিছু আ্যপ্লিকেশন হচ্ছে ইমেইল, এফটিপি (ফাইল ট্রান্সফার প্রোটোকল), এসএসএইচ (SSH) ইত্যাদি। ইন্টারনেট বলতে বস্তুত এই পৃথিবীব্যাপী নেটওয়ার্কেই বুঝায়। ওয়েবই আসলে সবচেয়ে দৃশ্যমান এবং সবচেয়ে বেশি ব্যাবহৃত ইন্টারনেট আ্যপ্লিকেশন। ওয়েব এর মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে তথ্যের সহজলভ্যতা। তথ্য বলতে যে শুধু জ্ঞান-বিজ্ঞান সম্পর্কিত বিষয় বুঝায় তা কিন্তু নয়। দৈনন্দিন জীবনে আমাদের যাকিছু জানার প্রয়োজন তাই তথ্য। আমার বন্ধু সেন্ট মার্টিন দ্বীপে বেড়াতে গেছে সেটি একটি তথ্য, সেখানে ও অনেক ছবি তুলেছে সেই ছবিগুলোও একধরণের তথ্য, সেখানে কোথায় ভালো খাবার পাওয়া যায় সেটাও তথ্য। তথ্যের এই বহুমাত্রিকতা শুরু হয় বিশেষ করে সোশাল নেটওয়ার্কগুলোর প্রচলন শুরু হওয়ার পর থেকে।

তথ্য আদান-প্রদানই হয়ে উঠছে ওয়েব ভিত্তিক কম্পানীগুলোর মূল ব্যবসা। গুগলের মূল মিশন হচ্ছে বিশ্বজগতের সব তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। ওয়েব এর প্রথম দিকে ব্যাপারটি ছিলো আমাদের নিজেদের দরকারী তথ্য খুঁজে নিতে হবে। কিন্তু এখন ধীরে ধীরে ব্যাপারটি এমন হতে চলেছে যে দরকারী তথ্য আমাদেরকে খুঁজে নিবে। গুগল, মাইক্রোসফট, ইয়াহু, ফেইসবুক, টুইটার, উইকিপিডিয়া, ফ্রেণ্ডফিড, মাইস্পেস, অরকুট, ডিগ, টেকমিম সবাই এই তথ্য প্রবাহ এবং যোগাযোগকে মানুষের আরো কাছে নিয়ে আসার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। আরএসএস এবং রিয়াল টাইম আপডেট এর মতো প্রযুক্তিগুলো আবিষ্কার হয়েছে এধরণের সেবা দেওয়ার জন্য। গতো কয়েক বছরে একটা জিনিস স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে মানুষ সংবাদের জন্য টেলিভিশন-সংবাদপত্র ইত্যাদির চেয়ে ওয়েব এর কাছেই বেশি যাচ্ছে। সংবাদ পড়ার জন্য আগে মানুষ সিএনএন, নিউইয়র্ক টাইমস, গুগল নিউজ ইত্যাদি সাইটে গেলেও ইদানিং সোশাল নেটওয়ার্ক এবং ব্লগ হয়ে উঠছে সংবাদের নতুন উৎস।

এ ব্যাপারটা প্রথম আমি খেয়াল করি গতো মার্চ মাসে আমেরিকান এয়ারলাইন্স এর একটি প্লেইন নিউ ইয়র্কের হাডসন নদীতে জরুরী অবতরণ করার পর। এই ঘটনার খবর সবার আগে জনসম্মুখে আসে টুইটারের মাধ্যমে। প্রত্যক্ষদর্শীদের (এবং উদ্ধারকারীদের) মধ্যে অনেকেই টুইটার ব্যবহারকারী ছিলেন এবং তারা প্রতিনিয়ত ছোট ছোট টুইট (১৪০ শব্দের ভেতর এসএমএস এর মতো অনলাইন মেসেজ) দিয়ে ঘটনার আপডেট দিচ্ছিলেন। টুইটারের সুবিধা হলো এটি ব্যবহার করে রিয়াল টাইম সংবাদ দেয়া যায়। এটাকে বলা যায় এসএমএস এর অনলাইন ভার্শন। কিন্তু এসএমএস দিয়ে যেখানে একসাথে একজনকে মেসেজ পাঠানো যায়, টুইটারের সাহায্যে সেখানে আক্ষরিক অর্থেই কয়েক মিলিয়ন মানুষের কাছে মেসেজ পাঠানো যায়। টুইটারের এমন উত্থানের পর সিএনএন, নিউ ইয়র্ক টাইমস এর মতো সংবাদ মাধ্যমগুলো অনেক দুশ্চিন্তায় আছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে সিএনএন (@cnnbrk) এবং নিউ ইয়র্ক টাইমস (@nytimes) দুটি’রই টুইটার একাউন্ট আছে! টুইটারকে অনেকেই বলছে গুগল এবং ফেইসবুকের নতুন প্রতিদ্বন্ধী। ফেইসবুকের সর্বশেষ ডিজাইনটি করা হয়েছে আসলে টুইটারকে নকল করে এবং একে টপকে যাওয়ার জন্য। খেয়াল করে দেখবেন ফেইসবুক সারাক্ষণ সবার স্টেটাস আপডেট আপনার পেইজে নিয়ে আসে। অনেক খবর, যেমন মাইকেল জ্যাকসনের মৃত্যু, মানুষ প্রথম জেনেছে ফেইসবুকে বন্ধুদের স্টেটাস মেসেজ থেকে!

টুইটার সর্বশেষ সবাইকে টপকে যায় সাম্প্রতিক ইরানের সাধারণ নির্বাচনের সময়। ইরান সরকারের নানারকম সেন্সরশীপের কারণে ইরানের ভেতরের খবর বাইরে যাবার পথ প্রায় বন্ধ তখন। ইরানের জনগণ তখন টুইটার ব্যবহার করে নির্বাচন পরবর্তী আন্দোলন-সহিংসতার খবর ওয়েবে পোস্ট করতে থাকে। সিএনএন এর মতোন সংবাদ সংস্থা যখন সংবাদ সরবরাহে ব্যর্থ হচ্ছিলো টুইটারের মতো অনলাইন মেসেজিং সাইট তখন হয়ে উঠলো সংবাদের প্রধান উৎস। এমনকি টুইটার তাদের নিয়মিত রক্ষনাবেক্ষণ কাজ পিছিয়ে দেয় ইরানের সংবাদ প্রবাহ চালু রাখার জন্য। টুইটারের এমন একচেটিয়া আধিপত্য দেখে গুগল আর ফেসবুক তড়িঘড়ি করে চালু করে ফার্সী সার্ভিস

সারা বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমগুলোর ব্যবহার কমে আসছে ওয়েব এর কারণে। এমনকি বিজ্ঞাপন এর একটা বড় অংশ চলে যাচ্ছে ওয়েবএ। ওয়েব এর বিজ্ঞাপন বাজার যে কতো বড় সেটার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হচ্ছে গুগল। কেবলমাত্র বিজ্ঞাপন এর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে কম্পানীটি। মাইক্রোসফট প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এই বাজারের একটা অংশ ধরার জন্য, যার সর্বশেষ সংযোজন হচ্ছে তাদের বিং সার্চ ইঞ্জিন এবং উইন্ডোজ আজুর ওয়েব অপারেটিং সিসটেম। সংবাদমাধ্যমগুলো যদি ওয়েবএ তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত না করে তাহলে তাদের ভবিষ্যত যে অন্ধকার সেটা প্রায় নিশ্চিত!

পৃথিবীজুড়ে ওয়েবএ প্রাপ্ত সার্ভিসগুলো মানুষের জীবনকে অনেক সহজ করে দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতে আরো দিবে। অনলাইনে কেনাকাটা, হারিয়ে যাওয়া বন্ধুকে ফেইসবুকের মাধ্যমে ফিরে পাওয়া, বাসার যাবতীয় বিল কম্পিউটারে কয়েকটি ক্লিকের মাধ্যমে সেরে ফেলা, বাস-ট্রেইন-প্লেইন এর টিকেট কয়েক মিনিটের মধ্যে অনলাইনে কিনে ফেলা, যে কোন ঘটনা-দুর্ঘটনার খবর কয়েক মিনিটের মধ্যেই ব্লগ ও সোশাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পেয়ে যাওয়া ইত্যাদি সুবিধা ইতোমধ্যে সবাই পেতে শুরু করেছে। এই গতিতে প্রযুক্তি চলতে থাকলে আর দশ-বিশ বছরের মধ্যে জীবন যে কতো সহজ হয়ে যাবে সেটা এখন কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। ওয়েব সেবা’র ব্যাপ্তি কয়েকগুন বেড়ে যাচ্ছে মোবাইল ফোনের সাহায্যে। ওয়েব একসেস সমৃদ্ধ মোবাইল ফোনকে এখন বলা হয় স্মার্ট ফোন। কপমিউটার এর চেয়ে অনেক বেশি বহনযোগ্য হওয়ায় মোবাইল এর মাধ্যমে আরো বেশি মানুষকে ওয়েব সেবার আওতায় নিয়ে আসা যাচ্ছে। আ্যপলের আইফোন, গুগলের এন্ড্রয়েড, মাইক্রোসফট এর উইন্ডোজ মোবাইল – এগুলো সবই প্রায় ডেস্কটপ কম্পিউটার এর সমান ক্ষমতা সম্পন্ন অপারেটিং সিসটেম মোবাইল এর জন্য। এভাবে মোবাইল ফোনগুলো হয়ে উঠছে একেকটি বহনযোগ্য কম্পিউটার। আমার জীবনের প্রথম কম্পিউটার ছিলো এএমডি কে৬ টু যার প্রসেসর স্পিড ছিলো ৪৫০ MHz. আ্যপলের সর্বশেষ আইফোন এর প্রসেসর স্পিড হচ্ছে ৬৫০ MHz!

ওয়েব কম্পানীগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার ফলে মানুষ বেশি বেশি সেবা পাচ্ছে কম মূল্যে বা (প্রায়ই) বিনা মূল্যে। গুগল, মাইক্রোসফট, ফেইসবুক, টুইটার, ফ্রেন্ডফিড এর মতো কম্পানীগুলো বাঘা বাঘা কম্পিউটার বিজ্ঞানী এবং সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে প্রযুক্তিকে আরো বেশি মানুষের কাজে লাগানোর জন্য। এতে ওদের ব্যবসা হচ্ছে ঠিক, কিন্তু পৃথিবীর সভ্যতার চাকাও ঘুরছে সামনের দিকে। মানুষের জীবন হয়ে উঠছে আরো আরামদায়ক। দুখের বিষয় আমরা বাংলাদেশে থেকে এর অনেক কিছুই পাচ্ছিনা শুধুমাত্র ভালো গতির ইন্টারনেট আর নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুত সরবরাহ এর অভাবে। আর এভাবেই আমরা পিছিয়ে পড়ছি বাকী পৃথিবী থেকে। আমাদের শীর্ষ রাজনীতিবিদ, সামরিক-বেসামরিক আমলা, ব্যবসায়ী – এরা যেদিন নিজেদের পরিবারের বাইরে দেশের মানুষের কথা ভাবা শুরু করবেন এবং যেদিন আমাদের দেশের মানুষেরা জীবনকে আরো বেশি ভালোবাসা শুরু করবে, আরো সাহসী আর এডভেঞ্চারাস হয়ে উঠবে, সেদিন থেকে বদলে যাওয়া শুরু করবে আমাদের দেশ!

“ভালোবাসার কাজটি খুঁজে নিতে হবে” – স্টিভ জবস এর বিখ্যাত সমাবর্তন বক্তৃতা

স্টিভ জবস আমার খুব প্রিয় একজন মানুষ। ২০০৫ সালে তিনি স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন বক্তা হিসেবে আমন্ত্রিত হন। সেখানে দেওয়া তাঁর বক্তৃতাটি ছিলো অসাধারণ একটি বক্তৃতা। সত্যি কথা বলতে কি এটা আমার জীবনে শোনা/পড়া সেরা বক্তৃতা। দুর্ভাগ্যক্রমে অনুবাদের পর এর আবেগ অনেকটাই হারিয়ে গিয়েছে! তবুও অনুবাদ করার লোভ সামলাতে পারলাম না। মূল ইংরেজী বক্তৃতাটি পাওয়া যাবে এখানেঃ http://news-service.stanford.edu/news/2005/june15/jobs-061505.html

ভালোবাসার কাজটি খুঁজে নিতে হবে
======================

পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে আসতে পেরে আমি খুবই সম্মানিত বোধ করছি। আমি কখনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করিনি। সত্যি কথা বলতে কি, আজকেই আমি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠান সবচেয়ে কাছ থেকে দেখছি। আজ আমি তোমাদেরকে আমার জীবনের তিনটি গল্প বলবো। তেমন আহামরী কিছু না। শুধু তিনটা গল্প।

প্রথম গল্পটি কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা এক সূতোয় বাঁধা নিয়ে (connecting the dots)।

রিড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার ছয় মাসের মাথায় আমি মোটামুটি পড়ালেখা ছেড়ে দিই। অবশ্য পুরোপুরি বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দেওয়ার আগে প্রায় বছর দেড়েক এটা সেটা কোর্স নিয়ে কোনমতে লেগেছিলাম। তো কেনো আমি বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দিয়েছিলাম?

ঘটনার শুরু আমার জন্মের আগে থেকে। আমার আসল মা ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অবিবাহিতা তরুণী গ্রাজুয়েট ছাত্রী। আমার জন্মের আগে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন আমাকে কারো কাছে দত্তক দিবেন। মা খুব চাচ্ছিলেন আমাকে যারা দত্তক নিবেন তাদের যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী থাকে। তো একজন আইনজীবি এবং তাঁর স্ত্রী আমাকে দত্তক নেওয়ার জন্য রাজি হলো। কিন্তু আমার জন্মের পর তাঁদের মনে হলো তাঁরা আসলে একটা কন্যা শিশু চাচ্ছিলেন।

অতএব আমার বর্তমান বাবা-মা, যারা অপেক্ষমাণ তালিকাতে ছিলেন, গভীর রাতে একটা ফোন পেলেন – “আমাদের একটা অপ্রত্যাশিত ছেলে শিশু আছে, আপনারা ওকে নিতে চান?” “অবশ্যই!” – আমার বাবা-মা’র তড়িৎ উত্তর। আমার আসল মা পরে জানতে পেরেছিলেন যে আমার নতুন মা কখনো বিশ্ববিদ্যালয় আর নতুন বাবা কখনো হাই স্কুলের গন্ডি পেরোননি। তিনি দত্তক নেবার কাগজপত্র সই করতে রাজী হননি। কয়েক মাস পরে অবশ্য তিনি রাজী হয়েছিলেন, আমার নতুন বাবা-মা এই প্রতিজ্ঞা করার পর যে তারা একদিন আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াবেন।

১৭ বছর পর আমি সত্যি সত্যি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমি বোকার মতো প্রায় স্ট্যানফোর্ডের সমান খরচের একটা বিশ্ববিদ্যালয় বেছে নিয়েছিলাম। এবং আমার নিম্ন মধ্যবিত্ত পিতামাতার সব জমানো টাকা আমার পড়ালেখার খরচের পেছনে চলে যাচ্ছিলো। ছয় মাস এভাবে যাওয়ার পর আমি এর কোন মানে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। জীবনে কী করতে চাই সে ব্যাপারে আমার তখনো কোন ধারণা ছিলোনা, এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখা এ ব্যাপারে কিভাবে সাহায্য করবে সেটাও আমি বুঝতে পারছিলাম না। অথচ আমি আমার বাব-মা’র সারা জীবনের জমানো সব টাকা এর পেছনে দিয়ে দিচ্ছিলাম। তাই আমি বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দেবার সিদ্ধান্ত নিলাম এবং আশা করলাম যে সবকিছু আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে। ওই সময়ের প্রেক্ষিতে এটা একটা ভয়াবহ সিদ্ধান্ত মনে হতে পারে, কিন্তু এখন পেছন ফিরে তাকালে মনে হয় এটা আমার জীবনের অন্যতম সেরা সিদ্ধান্ত ছিলো। যেই মুহুর্তে আমি বিশ্ববিদ্যালয়
ছেড়ে দিলাম সেই মুহুর্ত থেকে আমি আমার অপছন্দের অথচ ডিগ্রীর জন্য দরকারী কোর্সগুলো নেওয়া বন্ধ করে দিতে পারলাম, এবং আমার পছন্দের কোর্সগুলো নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়ে গেলো।

অবশ্য ব্যাপারটি অতোটা সুখকর ছিলোনা। ছাত্রহলে আমার কোন রুম ছিলোনা, তাই আমি আমার বন্ধুদের রুমে ফ্লোরে ঘুমাতাম। ব্যবহৃত কোকের বোতল ফেরত দিয়ে আমি পাঁচ সেন্ট করে পেতাম (প্রতি বোতল) যেটা দিয়ে আমি আমার খাবার কিনতাম। প্রতি রবিবার আমি সাত মাইল হেঁটে শহরের অপর প্রান্তে অবস্থিত হরে কৃষ্ণ মন্দিরে যেতাম শুধুমাত্র একবেলা ভালো খাবার খাওয়ার জন্য। কিন্তু আমি এটাকে পছন্দ করতাম। আমার কৌতুহল এবং ইনটুইশন অনুসরণ করে আমার জীবনে আমি যতোকিছু করেছি পরবর্তীতে সেটাই আমার কাছে মহামূল্যবান হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে। একটা উদাহরণ দিইঃ

সেই সময় রীড কলেজ সম্ভবত দেশের সেরা ক্যালিগ্রাফী কোর্সগুলো করাতো। ক্যাম্পাসের প্রত্যেকটি পোস্টার, প্রতিটি লেবেল করা হতো হাতে করা ক্যালিগ্রাফী দিয়ে। যেহেতু আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম না, তাই আমি যেকোনো কোর্স নিতে পারতাম। তাই ভাবলাম ক্যালিগ্রাফী কোর্স নিয়ে ক্যালিগ্রাফী শিখবো। আমি সেরিফ এবং স্যান সেরিফ টাইপফেইস শিখলাম, বিভিন্ন অক্ষরের মধ্যে স্পেস কমানো বাড়ানো শিখলাম, ভালো টাইপোগ্রাফী কিভাবে করতে হয় সেটা শিখলাম। ব্যাপারটা ছিলো দারুণ সুন্দর, ঐতিহাসিক, বিজ্ঞানের ধরাছোঁয়ার বাইরের একটা আর্ট। এবং এটা আমাকে বেশ আকর্ষণ করতো।

এই ক্যালিগ্রাফী জিনিসটা কখনো কোনো কাজে আসবে এটা আমি কখনো ভাবিনি। কিন্তু, দশ বছর পর যখন আমরা আমাদের প্রথম ম্যাকিন্টস কম্পিউটার ডিজাইন করি তখন এর পুরো ব্যাপারটাই আমাদের কাজে লেগেছিলো। ম্যাক কম্পিটার টাইপোগ্রাফী সমৃদ্ধ প্রথম কম্পিটার। আমি যদি দশ বছর আগে সেই ক্যালিগ্রাফী কোর্সটা না নিতাম তাহলে ম্যাক কম্পিউটারে কখনো মাল্টিপল টাইপফেইস এবং আনুপাতিক দুরত্মের ফন্ট থাকতো না। আর যেহেতু উইন্ডোজ ম্যাক এর এই ফন্ট নকল করেছে, বলা যায় কোনো কম্পিউটারেই এই ধরণের ফন্ট থাকতো না। আমি যদি বিশ্ববিদ্যালয় না ছাড়তাম তাহলে আমি কখনোই ওই ক্যালিগ্রাফী কোর্সে ভর্তি হতাম না, এবং কম্পিউটারে হয়তো কখনো
এতো সুন্দর ফন্ট থাকতো না। অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা অবস্থায় এই সব বিচ্ছিন্ন ঘটোনাগুলোকে এক সুতোয় বাঁধা অসম্ভব ছিলো, কিন্তু দশ বছর পর সবকিছু একেবারে পরিস্কার বোঝা গিয়েছিলো!

তুমি কখনোই ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোকে এক সূতায় বাঁধতে পারবেনা। এটা শুধুমাত্র পেছনে তাকিয়েই সম্ভব। অতএব, তোমাকে বিশ্বাস করতেই হবে বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলো একসময় একটা ভালো পরিণামের দিকে যাবে ভবিষ্যতে। তোমাকে কিছু না কিছুর উপর বিশ্বাস করতেই হবে – তোমার মন, ভাগ্য, জীবন, কর্ম, কিছু একটা। এই বিশ্বাস আমাকে কখনোই ব্যর্থ করে দেয়নি, বরং আমার জীবনের সব বড় অর্জনে বিশাল ভুমিকা রেখছে।

আমার দ্বিতীয় গল্পটি ভালোবাসা আর হারানো নিয়ে।

আমি সৌভাগ্যবান ছিলাম। আমি আমার জীবনের প্রথম দিকেই আমার ভালোবাসার কাজ খুঁজে পেয়েছিলাম। ওজ আর আমি আমার বাবা-মা’র বাড়ির গারাজে এপল কম্পানী শুরু করেছিলাম। তখন আমার বয়স ছিলো ২০ বছর।

আমরা কঠিন পরিশ্রম করেছিলাম – ১০ বছরের মাথায় এপল কম্পিউটার গারাজের ২ জনের কম্পানী থেকে ৪০০০ এম্পলয়ীর ২ বিলিয়ন ডলারের কম্পানীতে পরিণত হয়। আমার বয়স যখন ৩০ হয় তার অল্প কিছুদিন আগে আমরা আমাদের সেরা কম্পিউটার – ম্যাকিন্টস – বাজারে ছাড়ি। আর ঠিক তখনি আমার চাকরি চলে যায়। কিভাবে একজন তার নিজের প্রতিষ্ঠিত কম্পানী থেকে চাকরিচ্যুত হয়? ব্যাপারটি এমনঃ এপল যখন অনেক বড়ো হতে লাগলো তখন আমি কম্পানীটি খুব ভালোভাবে চালাতে পারবে এমন একজনকে নিয়োগ দিলাম। প্রথম বছর সবকিছু ভালোভাবেই গেলো। কিন্তু এরপর তার সাথে আমার চিন্তাভাবনার বিভাজন স্পষ্ট হওয়া শুরু হলো। এবং পরিচালনা পর্ষদ তার পক্ষ নিলো। অতএব, ৩০ বছর বয়সে আমি কম্পানী থেকে আউট হয়ে গেলাম। এবং খুব ভালোভাবে আউট হলাম। আমার সারা জীবনের স্বপ্ন এক নিমিষে আমার হাতছাড়া হয়ে গেলো। ঘটনাটা আমাকে বেশ ভেঙ্গে দিয়েছিলো।

এরপরের কয়েক মাস আমি বুঝতে পারছিলাম না আমি কী করবো। আমার মনে হচ্ছিলো আমি আগের প্রজন্মের উদ্যোগতাদের মনোবল ভেঙ্গে দিয়েছি – আমার হাতে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সেটা আমি করতে পারিনি। আমি ডেভিড প্যাকার্ড এবং বব নয়েস এর সাথে দেখা করে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাইলাম। একবার ভাবলাম ভ্যালী ছেড়ে পালিয়ে যাই। কিন্তু ধীরে ধীরে আমি একটা ব্যাপার অনুভব করতে লাগলাম – আমি আমার কাজকে এখনো ভালোবাসি! এপলের ঘটনাগুলি সেই সত্যকে এতোটুকু বদলাতে পারেনি। আমাকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে, কিন্তু আমি এখনো আমার কাজকে ভালোবাসি। তাই আমি আবার একেবারে গোড়া থেকে শুরু করার সিদ্ধান্ত নিলাম।

প্রথমে এটা তেমন মনে হয়নি, কিন্তু পরে আবিষ্কার করলাম এপল থেকে চাকরিচ্যুত হওয়াটা ছিলো আমার জীবনের সবচেয়ে ভালো ঘটনা। সফল হবার ভার চলে যেয়ে আমি তখন নতুন করে শুরু করলাম। কোন চাপ নেই, সবকিছু সম্পর্কে আগের চেয়ে কম নিশ্চিত। ভারমুক্ত হয়ে আমি আমার জীবনের সবচেয়ে সৃজনশীল সময়ে যাত্রা শুরু করলাম।

পরবর্তী পাঁচ বছরে আমি নেক্সট এবং পিক্সার নামে দুটো কম্পানী শুরু করি, আর প্রেমে পড়ি এক অসাধারণ মেয়ের যাকে আমি পরে বিয়ে করি। পিক্সার থেকে আমরা পৃথিবীর প্রথম এনিমেশন ছবি “টয় স্টোরী” তৈরি করি। পিক্সার বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে সফল এনিমেশন স্টুডিও। এরপর ঘটে কিছু চমকপ্রদ ঘটনা। এপল নেক্সটকে কিনে নেয় এবং আমি এপলএ ফিরে আসি। এবং নেক্সটএ আমরা যে প্রযুক্তি তৈরি করি সেটা এখন এপল এর বর্তমান ব্যবসার একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে। অন্যদিকে লরেন আর আমি মিলে তৈরি করি একটা সুখী পরিবার।

আমি মোটামুটি নিশ্চিত এগুলোর কিছুই ঘটতো না যদি না আমি এপল থেকে চাকরিচ্যুত হতাম। এটা ছিলো খুব তেতো একটা ওষুধ আমার জন্য, কিন্তু আমার মনে হয় রোগীর সেটা দরকার ছিলো। কখনো কখনো জীবন তোমাকে মাথায় ইট দিয়ে আঘাত করে। তখন বিশ্বাস হারাইওনা। আমি নিশ্চিত যে জিনিসটা আমাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো সেটা হচ্ছে – আমি আমার কাজকে ভালোবাসতাম। তোমাকে অবশ্যই তোমার ভালবাসার কাজটি খুঁজে পেতে হবে। তোমার ভালোবাসার মানুষটিকে যেভাবে তোমার খুঁজে পেতে হয়, ভালোবাসার কাজটিকেও তোমার সেভাবে খুঁজে পেতে হবে। তোমার জীবনের একটা বিরাট অংশ জুড়ে থাকবে তোমার কাজ, তাই জীবন নিয়ে সন্তুস্ট হওয়ার একমাত্র উপায় হচ্ছে চমৎকার কোনো কাজ করা। আর কোনো কাজ তখনি চমৎকার হবে যখন তুমি তোমার কাজকে ভালোবাসবে। যদি এখনো তোমার ভালোবাসার কাজ খুঁজে না পাও তাহলে খুঁজতে থাকো। অন্য কোথাও স্থায়ী হয়ে যেওনা। তোমার মন আর সব জিনিসের মতোই তোমাকে জানিয়ে দিবে যখন তুমি তোমার ভালোবাসার কাজটি খুঁজে পাবে। যে কোনো সম্পর্কের মতোই, তোমার কাজটি যতো সময় যাবে ততোই ভালো লাগবে। সুতরাং খুঁজতে থাকো যতক্ষন না ভালোবাসার কাজটি পাচ্ছো। অন্য কোন কাজে স্থায়ী হয়ো না।

আমার শেষ গল্পটি মৃত্যু নিয়ে।

আমার বয়স যখন ১৭ ছিলো তখন আমি একটা উদ্ধৃতি পড়েছিলামঃ “তুমি যদি প্রতিটি দিন এটা ভেবে পার কর যে আজই তোমার জীবনের শেষ দিন, তাহলে একদিন তুমি সত্যি সঠিক হবে”। এই লাইনটা আমার মনে গভীর রেখাপাত করেছিলো, এবং সেই থেকে গতো ৩৩ বছর আমি প্রতিদিন সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে জিজ্ঞেস করি – “আজ যদি আমার জীবনের শেষ দিন হতো তাহলে আমি কি যা যা করতে যাচ্ছি আজ তাই করতাম, নাকি অন্য কিছু করতাম?” যখনি এই প্রশ্নের উত্তর “না” হতো পরপর বেশ কিছু দিন, আমি জানতাম আমার কিছু একটা পরিবর্তন করতে হবে।

“আমি একদিন মরে যাবো” – এই কথাটা মাথায় রাখা আমার জীবনে আমাকে বড় বড় সব সিদ্ধান্ত নিতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে। কারণ সবকিছু – সকল আশা-প্রত্যাশা, গর্ব, ব্যর্থতার ভয় বা লজ্জা – এইসব কিছু মৃত্যুর মুখে নাই হয়ে যায়, শুধুমাত্র সত্যিকারের গুরুত্মপূর্ণ জিনিসগুলোই টিকে থাকে। তোমার কিছু হারানোর আছে এই চিন্তা দূর করার সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে এটা মনে রাখা যে একদিন তুমি মরে যাবে। তুমি নগ্ন হয়েই আছো।

অতএব নিজের মনকে না শোনার কোনো কারণই নাই।

প্রায় এক বছর আগে আমার ক্যান্সার ধরা পড়ে। সকাল ৭:৩০ এ আমার একটা স্ক্যান হয় এবং এতে পরিস্কারভাবে আমার প্যানক্রিয়াসএ একটা টিউমার দেখা যায়। আমি তখনো জানতাম না প্যানক্রিয়াস জিনিসটা কী। আমার ডাক্তাররা বললেন এই ক্যান্সার প্রায় নিশ্চিতভাবে আরোগ্য, এবং আমার আয়ু আর তিন থেকে ছয় মাস আছে। আমার ডাক্তার আমাকে বাসায় ফিরে যেয়ে সব ঠিকঠাক করতে বললেন। সোজা কথায় মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হওয়া।

এরমানে হচ্ছে তুমি তোমার সন্তানদের আগামী দশ বছরে যা বলবে বলে ঠিক করেছো তা আগামী কয়েক মাসের মধ্যে বলতে হবে। এরমানে হচ্ছে সবকিছু গোছগাছ করে রাখা যাতে তোমার পরিবারের সবার জন্য ব্যাপারটি যথাসম্ভব কম বেদনাদায়ক হয়। এরমানে হচ্ছে সবার থেকে বিদায় নিয়ে নেওয়া।

এভাবে সেদিন সারাদিন গেলো। সেদিন সন্ধ্যায় আমার একটা বায়োপসি হলো। তারা আমার গলার ভেতর দিয়ে একটা এন্ডোস্কোপ নামিয়ে দিলো, এরপর আমার পেটের ভেতর দিয়ে যেয়ে আমার ইনটেস্টাইন থেকে সুঁই দিয়ে কিছু কোষ নিয়ে আসলো। আমাকে অজ্ঞান করে রেখেছিলো তাই আমি কিছুই দেখিনি। কিন্তু আমার স্ত্রী পরে আমাকে বলেছিলো যে আমার ডাক্তাররা যখন এন্ডোস্কোপি থেকে পাওয়া কোষগুলি মাইক্রোস্কোপ এর নিচে রেখে পরীক্ষা করা শুরু করলো তখন তারা প্রায় কাঁদতে শুরু করেছিলো, কারণ আমার যে ধরণের প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সার হয়েছিলো সেটার আসলে সার্জারীর মাধ্যমে চিকিৎসা সম্ভব। আমার সেই সার্জারী হয়েছিলো এবং এখন আমি সুস্থ্য।

এটাই আমার মৃত্যুর সবচেয়ে কাছাকাছি যাওয়া, এবং আমি আশা করি আরো কয়েক দশকের জন্যও এটা তাই যেনো হয়। মৃত্যুর খুব কাছাকাছি যাওয়ার এই বাস্তব অভিজ্ঞতার কারণে মৃত্যু সম্পর্কে এখন আমি অনেক বেশি জানি, যেটা আমি জানতাম না যদি না এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে না যেতামঃ

কেউই মরতে চায় না। এমনকি যারা বেহেশতে যেতে চায়, তারাও সেখানে যাওয়ার জন্য তাড়াতাড়ি মরে যেতে চায় না। কিন্তু এরপরও মৃত্যুই আমাদের সবার গন্তব্য। কেউই কখনো এটা থেকে পালাতে পারেনি। এবং সেটাই হওয়া উচিৎ, কারণ মৃত্যু সম্ভবত জীবনের সবচেয়ে বড় আবিস্কার। এটা জীবনের পরিবর্তনের এজেন্ট। মৃত্যু পুরনোকে ধুয়ে মুছে নতুনের জন্য জায়গা করে দেয়। এই মুহুর্তে তোমরা হচ্ছো নতুন, কিন্তু খুব বেশিদিন দূরে নয় যেদিন তোমরা পুরনো হয়ে যাবে এবং তোমাদেরও ধুয়ে মুছে ফেলা হবে। নাটকীয়ভাবে বলার জন্য দুঃখিত, কিন্তু এটা খুবই সত্যি।

তোমাদের সময় সীমিত, অতএব, অন্য কারো জীবন যাপন করে সময় নষ্ট করো না। কোনো মতবাদের ফাঁদে পড়ো না, অর্থ্যাৎ অন্য কারো চিন্তা-ভাবনা দিয়ে নিজের জীবন চালিয়ো না। তোমার নিজের ভেতরের কন্ঠকে অন্যদের চিন্তা-ভাবনার কাছে আটকাতে দিও না। আর সবচেয়ে বড় কথাঃ নিজের মন আর ইনটুইশন এর কথা শোনার সাহস রাখবে। ওরা ঠিকই জানে তুমি আসলে কি হতে চাও। বাকী সব কিছু ততোটা গুরুত্মপূর্ণ নয়।

আমি যখন তরুণ ছিলাম তখন একটা পত্রিকা বের হতো যার নাম ছিলো “The Whole Earth Catalog” (সারা পৃথিবীর ক্যাটালগ). এটা ছিলো আমার প্রজন্মের একটা বাইবেল। এটা বের করেছিলেন স্টুয়ার্ড ব্র্যান্ড নামে এক ভদ্রলোক যিনি মেনলো পার্কের কাছেই থাকতেন। তিনি পত্রিকাটিকে কাব্যময়তা দিয়ে জীবন্ত করে তুলেছিলেন। এটা ছিলো ষাট এর দশকের শেষ দিককার কথা – কম্পিউটার এবং ডেস্কটপ পাবলিশিং তখনো শুরু হয়নি। তাই পত্রিকাটি বানানো হতো টাইপরাইটার, কাঁচি, এবং পোলারয়েড ক্যামেরা দিয়ে। পত্রিকাটিকে ৩৫ বছর আগের পেপারব্যাক গুগল বলা যায়ঃ অনেক তত্ত্ব-তথ্যে সমৃদ্ধ আর মহৎ উদ্দেশ্যে নিবেদিত।

স্টুয়ার্ট এবং তার টিম পত্রিকাটির অনেকগুলি সংখ্যা বের করেছিলো। পত্রিকাটির জীবন শেষ হয় একটা সমাপ্তি সংখ্যা দিয়ে। এটা ছিলো সত্তর এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে, আমার বয়স ছিলো তোমাদের বয়সের কাছাকাছি। সমাপ্তি সংখ্যার শেষ পাতায় একটা ভোরের ছবি ছিলো। তার নিচে ছিলো এই কথাগুলিঃ “ক্ষুধার্ত থেকো, বোকা থেকো”। এটা ছিলো তাদের বিদায় বার্তা। ক্ষুধার্ত থেকো। বোকা থেকো। এবং আমি নিজেও সবসময় এটা মেনে চলার চেষ্টা করে এসেছি। এবং আজ তোমরা যখন পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি ছেড়ে আরো বড় জীবনের গন্ডিতে প্রবেশ করছো, আমি তোমাদেরকেও এটা মেনে চলার আহবান জানাচ্ছি।

ক্ষুধার্ত থেকো। বোকা থেকো।

সবাইকে ধন্যবাদ।

বিল গেটস এর বাড়িতে এক সন্ধ্যা

মাইক্রোসফট এ আমার ইন্টার্ণশীপ শুরু হয় ২০০৭ সালের জুন মাসের ১২ তারিখে। কিন্তু ইন্টার্ণশীপ অফার পাই প্রায় তিন মাস আগে। অফার পাওয়ার পরপরই ইন্টারনেট ঘেঁটে জানতে পারি যে মাইক্রোসফট এর চেয়ারম্যান বিল গেটস প্রতি বছর ইন্টার্ণদের তাঁর বাসায় একটা বার্বিকিউ ডিনার এর দাওয়াত করেন। এটা শোনার পর মনে হচ্ছিলো ইন্টার্ণশীপের চেয়ে এই ডিনারটা বেশি গুরুত্মপূর্ণ! তার উপর জানতে পারলাম এই বছরই বিল গেটস শেষ ডিনার অনুষ্ঠান করবে, কারণ পরের বছর উনি মাইক্রোসফট ছেড়ে দিচ্ছেন। তাই অপেক্ষা করতে থাকলাম সেই কাংখিত দিনটির জন্য।

অবশেষে সেই বহু প্রত্যাশিত ইমেইলটি পেলাম। আমাকে অন্য সব ইন্টার্ণদের সাথে ২৮ শে জুন (যতোদূর মনে পড়ে) সন্ধ্যাবেলা মহামতি(!) বিল গেটস এর বাসায় ডিনার এর নিমন্ত্রণ করা হয়েছে! মাইক্রোসফট রেডমন্ড হেডকোয়াটার্সে প্রতি বছর প্রায় চার পাঁচ’শ ইন্টার্ণ গ্রীষ্মের ছুটিতে কাজ করতে আসে। সংখ্যাটা বড় মনে হতে পারে, কিন্তু মনে রাখতে হবে সারা পৃথিবীতে মাইক্রোসফট এর প্রায় ৯৫,০০০ এম্পলয়ী আছে, যার মধ্যে রেডমন্ড এর হেডকোয়াটার্সেই আছে প্রায় ৩৫,০০০। এক জায়গায় ৩৫,০০০ লোক কাজ করা মানে বিশাল ব্যাপার। মাইক্রোসফট এর রেডমন্ড ক্যাম্পাস ঢাকার অনেক আবাসিক এলাকার চেয়ে বড় হবে। প্রায় শ’খানেক বিল্ডিং জুড়ে এর অফিস, শ’খানেক শাটল কার দিনরাত চলাচল করে এই বিল্ডিংগুলোর মধ্যে মানুষ পারাপার করে।

যাই হোক। মাইক্রোসফট নিয়ে আরেকদিন লিখবো। আজকে বিল গেটস এর সাথে সাক্ষাতের গল্প বলি। ওই দিন বিকাল তিন টার দিকে বিল্ডিং ৩৩ এর সামনে চলে যাই। বিল্ডিং ৩৩ হচ্ছে মাইক্রোসফট এর কনফারেন্স সেন্টার। অনেকগুলো কনফারেন্স রুম আছে এখানে। বিল গেটস এর ৩০ শে জুন ২০০৮ এর বিদায়ী মিটিংও এখানে হয়েছিলো। আমার সাথে আমার দুই ইন্ডিয়ান বন্ধু ছিলো। ওরাও আমার মতোই ইন্টার্ণ। একজন রচেস্টার ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করছে আরেকজন টেক্সাস অস্টিনএ মাস্টার্স করছে। আমরা তিন জনই উইন্ডোজ নেটওয়ার্কিং গ্রুপ এ ছিলাম। তো বিল্ডিং এর সামনে অনেকগূলো বাস দাঁড়ানো ছিলো যেগুলো আমাদের বিল গেটস এর বাসায় নিয়ে যাবে। ইন্টার্ণরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে গল্পগুজব করছে। একে অন্যের সাথে পরিচিত হচ্ছে। আমাদের লাইনে অনেকের মধ্যে ক্যালটেক থেকে আসা দুই বন্ধু ছিলো যাদের সাথে আমি অনেক্ষন কথা বলেছি। একজন কম্পিউটার সায়েন্সে আরেকজন গণিতের উপর পড়ছে ক্যালটেকে। একজন এখন আমাদের গ্রুপ নেটয়ার্কিংএ, আর আরেকজন উইন্ডোজ কার্নেল গ্রুপএ ইন্টার্ণশীপ করছে। ওদের সাথে কথা বলে বুঝতে পারলাম মানুষ কেন ক্যালটেক এর এতো সুনাম করে। দুজনই অসম্ভব প্রতিভাবান। যে নেটয়ার্কিং গ্রুপ এর সে এর আগের বছর ইন্টার্ণশীপ করেছে গুগলএ, তার আগের বছর ইয়াহু তে! এবার মাইক্রোসফটএ এসেছে দেখার জন্য মাইক্রোসফট তার কেমন লাগে! আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম, তিনটাই তো দেখলে, কোন কোম্পানীতে কাজ করতে চাও? আমি আশা করছিলাম ও গুগল বা মাইক্রোসফট এর নাম বলবে। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে ও আমাকে বললো ও একটা স্টার্ট-আপ, মানে নিজেই নতুন একটা কোম্পানী খুলতে চায়! তখন আমি বুঝলাম কিভাবে আমেরিকাতে সিলিকন ভ্যালীর জন্ম হয়। এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপকে এরা খুব দাম দেয়। এরা ঝুঁকি নিতে পারে।

সে যাক, বারবার অন্যদিকে চলে যাচ্ছি। তো একসময় আমাদের সবাইকে বাসে উঠানো হলো। বাসে ইন্টার্ণদের গল্পগুজবে একটা হাউকাউ অবস্থা। বিল গেটস এর বাসা মাইক্রোসফট অফিস থেকে খুব দূরে নয়। জ্যাম না থাকলে ১০/১২ মিনিটের ড্রাইভ হবে বড়জোর। তাই মিনিট দশেক পরে যখন বাস থেমে গেল ভাবলাম চলে এসেছি বোধহয়। বাস থেকে নেমে ভুল বুঝতে পারলাম। আমাদের আসলে নিয়ে আসা হয়েছে একটা বড় গীর্জার সামনে। অবাক হলাম। বিল গেটস এর বাসায় ডিনার খেতে যাওয়ার আগে গীর্জায় প্রার্থনা করতে হবে নাকি? আস্তে আস্তে ব্যাপারটি পরিস্কার হলো। আমাদের এখানে নিয়ে আসা হয়েছে সিকিউরিটি চেক এর জন্য! গীর্জার সামনে পেছনে যেহেতূ অনেক খোলা জায়গা, তাই আমাদের এখানে লাইন ধরে মেটাল ডিটেকটর এর মধ্য দিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। আমাদের আগেই বলে দেওয়া হয়েছিলো কোন মোবাইল ফোন বা ক্যামেরা সাথে আনা চলবে না (এর চেয়ে দুঃখের ব্যাপার আর কী হতে পারে!)। আর এখন মেটাল ডিটেকটর দিয়ে শেষবারের মতো চেক করে নেওয়া হলো কোন ধাতব জিনিস আছে কিনা কারো সাথে।

সিকিউরিটি চেক করা শেষ হবার পর আমাদের এবার ছোট ভ্যানের (মাইক্রোবাস এর মতো) মতো গাড়িতে তোলা হলো। বিশাল সাইজের বাস যেহেতূ বিল গেটস এর বাড়িতে ঢুকবেনা, তাই ছোট গাড়ির ব্যবস্থা। গীর্জা থেকে বিল গেটস এর বাড়ী ছিলো খুব কাছে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমাদের গাড়িটি বাড়ির মূল গেইট দিয়ে ঢুকে পড়লো। বাড়িটি চারদিকে গাছগাছালীতে ঢাকা। তাই তেমন কিছু খেয়াল করতে পারিনি বাড়ির বাইরের অংশের। গাড়ি থেকে নেমেই আমাদের একটা দরজা দিয়ে বিল গেটস এর বাড়িতে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। ঢুকেই আমাদের একটা সিঁড়ি দেখিয়ে দেওয়া হয়।। কাঠের সিঁড়ি। আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম সেখান থেকে সে সিঁড়ি নেমে গেছে প্রায় চার-পাঁচ তলা সমান নিচের দিকে।

Bill Gates House

সিঁড়ি বেয়ে নামা শুরু করলাম আমরা। একপাশে মূল বাড়ির ভেতরের অংশ আর আরেকপাশে একটা বিশাল ড্রয়িং রুম দেখলাম। যেহেতু আমাদের ডানেবামে কোথাও ঢুকার অনুমতি নাই, তাই সোজা নিচে নেমে যেতে হলো। নিচে নেমে দেখতে পেলাম বিশাল ঘাসে ঢাকা বাড়ির ব্যাক-ইয়ার্ড। জায়গাটা ছিলো লেক ওয়াশিংটন এর পাশে। লেক এর পাড়ে বিল গেটস এর প্রাসাদপ্রম বাড়ি। সবুজ ঘাসে ঢাকা উঠানের এখানে সেখানে টেবিল এর উপর নানা রকম খাবার রাখা। সবই আমেরিকান খাবার। আমেরিকানরা লতাপাতা (সালাদ হিসেবে) টাইপের অনেক খাবার খায় সেগুলো ছিলো, বিভিন্ন ধরণের বার্গার ছিলো, স্যান্ডউইচ ছিলো, সামুদ্রিক মাছের কিছু আইটেম ছিলো, নানারকম ড্রিঙ্কস ছিলো। আরো অনেক রকম খাবার ছিলো যেগুলোর নাম মনে নাই।

সেদিন কোম্পানীর অনেক বড় এক্সিকিউটিভরা ছিলেন সেখানে। সবাই মাইক্রোসফট এর ভাইস প্রেসিডেন্ট কিংবা সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট বা এই গোছের কিছু। ইন্টার্ণরা কেউ কেউ খাবার নিয়ে নিজেদের মধ্যে আড্ডা দিচ্ছিলো, আবার কেউ কেউ কোম্পানীর সিনিয়র এক্সিকিউটিভদের ঘিরে ধরে নানারকম প্রশ্ন করছিলো। আমি আমার ইন্ডিয়ান বন্ধুদের সাথে বসে গল্প করছিলাম। আর কয়েকজন এক্সিকিউটিভ এর কথা শুনছিলাম। এদের মধ্যে একজন হচ্ছেন উইন্ডোজ ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ এর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট স্টিভেন সিনফস্কি। ইন্টার্ণরা ওনাকে বিভিন্ন প্রশ্ন করছিলো আর উনি প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন। আমি কথা বলেছিলাম আমাদের কোর অপারাটিং সিস্টেম গ্রুপ এর একজন জেনারেল ম্যানেজার এর সাথে। উইন্ডোজ নিয়ে টুকটাক কথা বলেছিলাম আমরা ওনার সাথে। এদের সাথে কথা বললে বুঝা যায় এরা কতো স্মার্টভাবে একটা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। টেকনিকাল এবং মার্কেটিং উভয় দিকে এদের দারুন দখল।

প্রায় আধঘন্টা-পৌণে একঘন্টা পর মুল বাড়ির সাথে সংলগ্ন অপর একটি সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসেন বিল গেটস। আর যায় কোথায়। এখানকার বেশির ভাগ ইন্টার্ণই বিশ-বাইশ বছর বয়সের। সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়লো তাঁর উপর। ওনার চারদিকে তৈরি হয়ে গেলো বিশাল ভিড়। প্রথমে উনি ইন্টার্ণদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিলেন। ইন্টার্ণরা দুনিয়ার সব প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছিলো তাকে। অনেক্ষণ ওদের সাথে কাটিয়ে উনি ভিড় থেকে বের হয়ে একটু উঁচুমতো একটা যায়গায় গিয়ে মাইক এর মাধ্যমে সবাইকে স্বাগতম জানালেন। বললেন তাঁর স্বপ্নের কথা, পরিশ্রম করে মাইক্রোসফটকে এই পর্যায়ে নিয়ে আসার কথা। গুগলের কথা বললেন। ওরা যে সার্চএ ভালো করছে আর আমাদের জন্য যে এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ সেটি বললেন। প্রায় মিনিট পনের মাইক্রোসফট সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে কথা বললেন।

সেদিন অনেক কাছে থেকে ওনাকে দেখেছি আর কথা শুনেছি। মাইক্রোসফট এর ব্যাবসায়ীক পলিসি নিয়ে অনেকরকম মতামত থাকতে পারে, কিন্তু “সফটওয়ার শিল্প” বলতে আমরা যা বুঝি এটা প্রায় এককভাবে মাইক্রোসফট তথা বিল গেটস এবং তাঁর টিম প্রতিষ্ঠা করেন। বিল গেটস একজন চরম প্রতিভাবান ব্যক্তি। তার ব্যাবসায়ীক এবং প্রযুক্তিগত দুই দিকেই অভাবনীয় দখল। মানবতার প্রতিও তাঁর অনেক টান। সেজন্য এই বছর তিনি মাইক্রোসফট থেকে অবসর (পুরোপুরি নয়, কিন্তু উনি এখন মূলত উপদেষ্টা ধরণের ভূমিকায় আছেন) নিয়ে মনোনিবেশ করেছেন মানবসেবায়। তাঁর বিল এন্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দাতব্য প্রতিষ্ঠান। অনেকে বলছেন বিল গেটস হয়তো একদিন শান্তির জন্য নোবেল প্রাইজ পাবেন তাঁর মানবতাবাদী কাজের জন্য। গতো বছর হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া তাঁর সমাবর্তন বক্তৃতার একটা মূল বিষয় ছিলো মানবসেবা।

বিল গেটস চাল-চলনে একেবারে সাধারণ। কেউই তাকে দেখে মনে করবে না কতো ক্ষমতাধর, কতো স্মার্ট উনি। সেদিন একটা সাধারণ জিন্স আর টিশার্ট পরে এসেছিলেন তিনি। তাঁর কথাবার্তা খুবই সহজসরল। এই বছর যেদিন তিনি মাইক্রোসফট থেকে বিদায় নেন, মঞ্চে সবার সামনে অনেকটা ঢুকরে কেঁদে উঠেছিলেন। তাঁকে দেখেই বুঝা যায়, তিনি বাইরে আর দশজন সাধারণ মানুষের মতন হলেও ভেতরে তাঁর অগাধ জ্ঞান। এই সারল্য, বুদ্ধি, আর জ্ঞানের বলেই তিনি আজ মাইক্রোসফট এর মতো এক বিশাল কোম্পানী প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন।

খাওয়া-দাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে আমি ঘুরে দেখেছিলাম বাড়িটি। চারদিকে সিকিউরিটির লোকজন ছিলো, তার উপর আমাদের বাড়ির ভেতরে যাবার অনুমতি ছিলো না। তাই বাইরে থেকে যতোটুকু দেখা যায় তাই দেখেছি। লেক এর পাশে বাড়ি হওয়ায় লেক এর উপর কাঠের পাটাতন ছিলো। সেখানে একটা বড় স্পীডবোট বাঁধা ছিলো। লেক এর অপর পাড়ে সিয়াটল শহরের উঁচু উঁচু বিল্ডিং এর আকাশরেখা দেখা যাচ্ছিলো। যতোদূর মনে পড়ে ওনার ব্যক্তিগত জিমনেশিয়ামটি দেখেছিলাম যেটি মূল বাড়ি থেকে বাইরে অবস্থিত। বাড়িটি আকারে বেশ বড়। অনেক টাকা খরচ করে বানানো। পৃথিবীর সবচেয়ে ধনাঢ্য ব্যক্তির বাড়ি বলে কথা!

সব মিলিয়ে ঘন্টা দুই এর মতো থাকা হলো ওখানে। ফেরার সময় হয়ে এলো। ইন্টার্ণরা ধীরে ধীরে বের হওয়া শুরু করলো বাড়ি থেকে। এক সময় আমিও বের হলাম। আর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলাম আমার ভাগ্যের কাছে। এমনিতে আমার সৌভাগ্য জিনিসটা পাওয়া হয়ে উঠেনা কখনো। তাই এমন একটা সু্যোগ পেয়ে নিজেকে অনেক ধন্য মনে করেছি। তার উপর ওই বছরই ছিলো বিল গেটস এর শেষ ইন্টার্ণ ডিনার। এটাকে নির্দ্বিধায় বড় ধরণের সৌভাগ্য বলা যায়, কী বলেন?

ঝাপসা নীল বিন্দু

ভয়েজার ১ উপগ্রহটি ১৯৯০ সালের দিকে সৌরজগত ছেড়ে অসীম মহাশুন্যের দিকে যাত্রা শুরু করে। পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র থেকে তখন ভাবা হলো উপ্পগ্রহটিতো সারা জীবনের জন্য সৌরজগত ছেড়ে চলে যাচ্ছে, যাওয়ার আগে সৌরজগৎটার কিছু ছবি তুলে নেওয়া যাক। যেই ভাবা সেই কাজ। উপগ্রহটিকে পুরো উলটো দিকে ঘুরানো হলো। এরপর এর ক্যামেরা দিয়ে তোলা হলো বেশ কিছু ছবি। ছবি তোলা শেষে উপগ্রহটিকে আবার তার গতিপথে অর্থ্যাৎ মহাশুন্যের দিকে ছেড়ে দেওয়া হলো।

মজার ব্যাপার ঘটলো যখন বিজ্ঞানীরা ছবিগুলোর দিকে ভালো করে তাকালেন। বিশেষ করে পৃথিবীর যেই ছবিগুলো তুলেছে ভয়েজার ১। ছবিগুলো তোলা হয়েছিলো প্রায় চার বিলিয়ন (চার’শ কোটি) মাইল দূর থেকে। ভয়েজার ১ তখন ছিলো সৌরজগতের এক প্রান্তে। পৃথিবীর একটা ছবিটি এসেছে একটা আলোর বিন্দু হিসেবে। ন্যারো এঙ্গেল ক্যামেরা দিয়ে তোলার কারণে ছবিটাতে কয়েকটি আলোর রেখা (সূর্যের আলো থেকে প্রতিফলিত) চলে এসেছে। ওই রকম একটা আলোর সরু রেখার মধ্যে একটা অতি ক্ষুদ্র ঝাপসা নীল বিন্দু হিসেবে এসেছে পৃথিবী।

Pale Blue Dot

পৃথিবীর ওই ছবিটি সবচেয়ে বেশি আলোড়িত করেছিলো বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, কার্ল সাগানকে। এমনিতেই সাগান পৃথিবী আর বিশ্বজগৎ নিয়ে গবেষণা করতেন। তাই চার বিলিওয়ন মাইল দূর থেকে তোলা পৃথিবীর বিন্দুসম ছবিটি দেখে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। ১৯৯৬ সালে এক সমাবর্তন বক্তৃতায় (ওই বছরই তিনি মারা যান) তিনি পৃথিবীর ওই বিন্দুর মতো ছবিটিকে “Pale Blue Dot” আখ্যা দেন এবং খুব মর্মস্পর্শীভাবে পৃথিবীর প্রতি তার ভালোবাসা প্রকাশ করেন। আমি এখানে তার বক্তৃতার প্রাসঙ্গিক অংশটুকু বাংলায় তুলে দিচ্ছি।

“এই বিন্দুটির দিকে তাকান। এটা এই পৃথিবীর ছবি। এটাই আমাদের বাড়ী। এটাই আমরা। আমরা যাদের ভালোবাসি, আমরা যাদের চিনি জানি, আমরা যাদের কথা শুনেছি, সবাই এই বিন্দুতেই থাকে। সৃষ্টির শুরু থেকে যতো মানুষ বেঁচে ছিলো সবাই এই বিন্দুতেই বেঁচে ছিলো। আমাদের সারা জীবনের সব দুঃখ কষ্ট, হাজার হাজার আত্মবিশ্বাসী ধর্ম, মতবাদ, এবং অর্থনৈতিক তত্ব, যারা শিকার করেছে এবং যারা লুন্ঠন করেছে, সাহসী বীর এবং ভীরু মানুষেরা, যারা সভ্যতা সৃষ্টি করেছে এবং যারা সভ্যতা ধ্বংস করেছে, সব রাজা এবং প্রজা, সব প্রেমে মগ্ন তরুণ তরুণী, সব পিতা ও মাতা, স্বপ্নে বিভোর কিশোর কিশোরী, আবিষ্কারক এবং পরিভ্রমক, নৈতিকতার শিক্ষক, দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ, তারকা শিল্পী-খেলোয়াড়, মহামান্য নেতা, সাধু এবং পাপী; আমাদের মানবজাতীর ইতিহাসে যারাই বেঁচেছিলো সবাই বাস করতো ওই আলোর রেখায় ভাসমান ক্ষুদ্র ধুলাবিন্দুতে।

মহাবিশ্বের বিশালত্বের মাঝে পৃথিবীটা একটা ক্ষুদ্র মঞ্চ। কতো শত সম্রাট আর সমরনায়ক রক্তের নদী বইয়ে দিয়েছেন শুধুমাত্র এই ক্ষুদ্র বিন্দুর একটা ক্ষুদ্র অংশের বিজয়ী বীর হওয়ার জন্যে। এই বিন্দুর এক প্রান্তের মানুষেরা নৃশংসতা চালিয়ে ধ্বংস করেছে আরেক প্রান্তের মানুষদের। কী ভয়াবহ দ্বন্ধ তাদের মধ্যে, কী তীব্রভাবে একে অন্যকে হত্যা করতে চায়, কী গভীর ঘৃণা তাদের পরস্পরের প্রতি।

আমাদের নিজেদের সম্মন্ধে উঁচু ধারণা, কল্পিত অহম, এই ধারণা যে আমরা এই বিশ্বজগতে অন্য প্রানীদের থেকে বেশি মহান কোন অবস্থানে আছি – এর সবকিছু এই ঝাপসা নীল বিন্দু দ্বারা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। আমাদের এই গ্রহ মহাবিশ্বের মহাঅন্ধকারের মধ্যে একটা নিঃসঙ বিন্দু। এই বিশাল বিশ্বজগতের মধ্য থেকে কেউ এসে আমাদেরকে নিজেদের নিজেরা ধ্বংস করা থেকে বাঁচাবে না।

এখন পর্যন্ত পৃথিবীই একমাত্র জানা জায়গা যেখানে জীবন বেঁচে থাকতে পারে। মানুষের আর কোন যাওয়ার জায়গা নেই। অন্তত নিকট ভবিষ্যতে নয়। ভ্রমণ সম্ভব, কিন্তু যেয়ে বসতি গড়া? খুব শীঘ্রই সেটি হচ্ছে না নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। আমাদের ভালো লাগুক বা না লাগুক, এই মুহুর্তে পৃথিবীই একমাত্র যায়গা যেখানে আমরা জীব হিসেবে টিকে থাকতে পারি।

বলা হয়ে থাকে জ্যোতির্বিজ্ঞান মানুষকে বিনয়ী করে আর চরিত্র গঠনে সাহায্য করে। চার বিলিয়ন মাইল দূর থেকে তোলা পৃথিবীর এই ছবির চেয়ে আর কিছুই সম্ভবত মানুষের অহমিকাকে এতো খাটো করে দেয় নাই। আমার মনে হয়, এটা আমাদের একজনের সাথে আরেকজনের আরো সহানুভূতি নিয়ে চলার কথা মনে করিয়ে দেয়, আরো মনে করিয়ে দেয় এই ঝাপসা নীল বিন্দুটিকে যত্ন এবং সংরক্ষণ করার কথা, যেটা আমাদের একমাত্র বাসভূমি।”

সত্যি কথা বলতে কি মূল ইংরেজীতে লেখাটির যে গভীর আবেগ ছিলো সেটা বাংলা অনুবাদের সময় পুরোটা ফুটিয়ে তোলা যায়নি। অনুবাদ নিয়ে এই সমস্যাটা প্রায়ই হয়।

সে যাই হোক। আজকের পৃথিবীর মানুষে মানুষে যে ঘৃণা আর দ্বন্ধ তার দিকে তাকালে খুবই আফসোস হয়। পৃথিবীর সব বালুকণার মধ্যে একটি কণা যেমন অতি ক্ষুদ্র তুচ্ছের মতো, তেমনি আমাদের পৃথিবী এই মহাবিশ্বের অসীম সংখ্যক নক্ষত্র আর বস্তুপিন্ডের মধ্যে ক্ষুদ্র একটি বালুকণা। ঝড়, বন্যা, খরা, গ্রীন হাউজ এফেক্ট, সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, মাত্রারিরিক্ত জনসংখ্যার তুলনায় অপ্রতুল খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান, পারমাণবিক বোমার হুমকি, ভূ-পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি – ইত্যাদি হাজারো প্রাকৃতিক এবং মানুষের সৃস্টি সমস্যার মুখে আমাদের পৃথিবী। নিজেদের ভেতরের বানানো দ্বন্ধের চেয়ে বেশি গুরুত্মপূর্ণ এই মুহুর্তে আমাদের একমাত্র বাসভূমি এই পৃথিবীকে বাঁচানো।

ভয়েজার ১ এর তোলা ঝাপসা নীল বিন্দুটি আমাদের বিপন্ন পৃথিবীর প্রতি আরো মমতাময়ী হতে বলে, নিজেদের ভেতরের ঘৃণা কমিয়ে ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার কথা বলে।

উইকিপেডিয়া লিঙ্কঃ http://en.wikipedia.org/wiki/Pale_Blue_Dot

ইউটিউব:

ওগো মা তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফিরে…

আমি অন্য দেশের দেশাত্মবোধক গান তেমন শুনিনি। কিন্তু বাংলাদেশের দেশাত্মবোধক গান শোনার পর মনে হয় এতো সুন্দরভাবে দেশের প্রতি ভালোবাসার কথা, মমতার কথা, আর কেউ বোধহয় প্রকাশ করতে পারবে না।

এই বিজয় দিবসে আমি অনেকগুলো দেশাত্মবোধক গান শুনছিলাম। আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি, এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলো যারা, জয় বাংলা বাংলার জয়, ও আমার দেশের মাটি – প্রতিটি গানে দেশের প্রতি কী অপূর্ব মমতা! তবে যে গানটি আমি সবচেয়ে বেশি গুনগুন করে গেয়েছি সেটি হলো আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি… এ কয় দিনে গানটা অসংখ্যবার শুনেছি। ভেবে পাইনা এতো সুন্দর করে কীভাবে মা আর মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা যায় শুধু একটি গান দিয়ে! গানটির কথা আর সুর দুটোই অসাধারণ। এই গানটির সুর অন্য অনেক রবীন্দ্রসঙ্গীতের চেয়ে একটু ভিন্ন। করুণ ভাবটা নেই। একেবারে হৃদয় ছুঁয়ে যায়।

গানটি শোনার জন্য এখানে ক্লিক করুন

গানের কথাঃ

আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি
তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী!
ওগো মা, তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফিরে!
তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে।

ডান হাতে তোর খড়্গ জ্বলে, বাঁ হাত করে শঙ্কাহরণ,
দুই নয়নে স্নেহের হাসি, ললাটনেত্র আগুনবরণ।
ওগো মা, তোমার কী মুরতি আজি দেখি রে!
তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে।
তোমার মুক্তকেশের পুঞ্জ মেঘে লুকায় অশনি,
তোমার আঁচল ঝলে আকাশ ত’লে রৌদ্রবসনী!
ওগো মা, তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফিরে!
তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে।

যখন অনাদরে চাইনি মুখে ভেবেছিলাম দুঃখিনী মা
আছে ভাঙা ঘরে একলা পড়ে, দুঃখের বুঝি নাইকো সীমা ।
কোথা সে তোর দরিদ্র বেশ, কোথা সে তোর মলিন হাসি-
আকাশে আজ ছড়িয়ে গেলো ওই চরণের দীপ্তিরাশি!
ওগো মা, তোমার কী মুরতি আজি দেখি রে!
তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে।

আজি দুখের রাতে সুখের স্রোতে ভাসাও ধরণী-
তোমার অভয় বাজে হৃদয় মাঝে হৃদয়হরণী!
ওগো মা, তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফিরে!
তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে।

(কৃতজ্ঞতাঃ সচলায়তন ওয়েবসাইট)

I’m just travelin’, travelin’, travelin’, I’m just travelin’ on

A very favorite song of mine, by Dolly Parton. Listen to it a lot these days…

***********************************************************************

Well I can’t tell you where I’m going, I’m not sure of where I’ve been
But I know I must keep travelin’ till my road comes to an end
I’m out here on my journey, trying to make the most of it
I’m a puzzle, I must figure out where all my pieces fit

Like a poor wayfaring stranger that they speak about in song
I’m just a weary pilgrim trying to find what feels like home
Where that is no one can tell me, am I doomed to ever roam
I’m just travelin’, travelin’, travelin’, I’m just travelin’ on

Questions I have many, answers but a few
But we’re here to learn, the spirit burns, to know the greater truth
We’ve all been crucified and they nailed Jesus to the tree
And when I’m born again, you’re gonna see a change in me

God made me for a reason and nothing is in vain
Redemption comes in many shapes with many kinds of pain
Oh sweet Jesus if you’re listening, keep me ever close to you
As I’m stumblin’, tumblin’, wonderin’, as I’m travelin’ thru

I’m just travelin’, travelin’, travelin’, I’m just travelin’ thru
I’m just travelin’, travelin’, travelin’, I’m just travelin’ thru

Oh sometimes the road is rugged, and it’s hard to travel on
But holdin’ to each other, we don’t have to walk alone
When everything is broken, we can mend it if we try
We can make a world of difference, if we want to we can fly

Goodbye little children, goodnight you handsome men
Farewell to all you ladies and to all who knew me when
And I hope I’ll see you down the road, you meant more than I knew
As I was travelin’, travelin’, travelin’, travelin’, travelin’ thru

I’m just travelin’, travelin’, travelin’, I’m just travelin’
Drifting like a floating boat and roaming like the wind
Oh give me some direction lord, let me lean on you
As I’m travelin’, travelin’, travelin’, thru

I’m just travelin’, travelin’, travelin’, I’m just travelin’ thru
I’m just travelin’, travelin’, travelin’, I’m just travelin’ thru

Like the poor wayfaring stranger that they speak about in song
I’m just a weary pilgrim trying to find my own way home
Oh sweet Jesus if you’re out there, keep me ever close to you
As I’m travelin’, travelin’, travelin’, as I’m travelin’ thr

প্রজাপতি মন

কতো কিছুই না হতে চেয়েছি এই জীবনে। কতো কিছুই না চেয়েছি পেতে।

একেবারে ছোটকালে, যখন ক্লাস সেভেন এইট এ পড়ি, তখন সেবা প্রকাশনীর তিন গোয়েন্দা পড়তাম। তিন গোয়েন্দার দল – কিশোর, রবিন, আর মুসা – রোমাঞ্চকর সব রহস্য সমাধান করে বেড়াতো। আমার কিশোর মন কী যে শিহরিত হতো ওদের এডভেঞ্চার এর কাহিনী পড়ে। কল্পনায় ভিড়ে যেতাম ওদের দলে আর সমাধান করে বেড়াতাম চাঞ্চল্যকর সব রহস্যের! ওদের সাথে আমিও ঘুরে বেড়াতাম লস এঞ্জেলেসের রকী বীচ এলাকায়। কিশোরদের বাসার পাশের গারাজের হেডকোয়াটার্সে ওদের সাথে আমিও যে রহস্য সমাধানে আমার মাথা খাটাতাম এটা ওরা কোনদিন জানতে পারবে না! সে এক অদ্ভুত যাদুকরী রোমাঞ্চকর জীবন। দুষ্ট মানুষদের সকল চক্রান্তের জাল ছিন্ন করে তিন গোয়েন্দার দল আর আমি মিলে সমাধান করে দিতাম জটিল সব রহস্যের…

আরেকটু বড় হবার পর, নাকের নিচে যখন গোঁফের হালকা কালো রেখা দেখা দিতে শুরু করলো, তিন গোয়েন্দার বই এর জায়গা ধীরে ধীরে দখল করা শুরু করলো মাসুদ রানার বই। সে এক অন্য জগত। বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স এর এক দুর্ধষ স্পাই, মাসুদ রানা ক্রমেই হয়ে উঠলো আমার স্বপ্নের নায়ক। গোপন মিশন নিয়ে দেশ থেকে দেশে ঘুরে বেড়ায় রানা। কোমলে কঠোরে মেশানো, অসম্ভব বুদ্ধিদীপ্ত চির সবুজ এক যুবক মাসুদ রানা। প্রথম বই ধ্বংস পাহাড় থেকে শুরু করে প্রায় দুইশ’র মতো বই পড়ে ফেলেছি বছর দুয়েকের মধ্যেই। আমাদের বাসার কাছেই ছিল একটা বইয়ের দোকান যেখানে সেবা প্রকাশনীর বই ভাড়া পাওয়া যেত। প্রতি বই দুই টাকা করে। পড়ে দুই-তিন দিনের মধ্যে ফেরত দিতে হতো। রানা’র বুদ্ধি, শক্তি, স্মার্টনেস, আর সুন্দরী রমণীদের সাথে রোমান্টিকতা, সবকিছু মিলে ওকে মনে হতো স্বপ্নের দেশে থাকা এক পুরুষ। কতো অসংখ্যবার প্রতিজ্ঞা করেছি বড় হলে স্পাই হবো, ঘুরে বেড়াবো দেশ থেকে দেশে, সমাধান করে বেড়াবো জটিল সব রহস্যের, সান্নিধ্যে আসবো রুপবতী সব নারীদের, কোমরের হোলস্টারে লুকানো থাকবে পিস্তল…

এসএসসি পাশের পর ভর্তি হই নটর ডেম কলেজে। ততোদিনে আমার চিন্তাভাবনা আর আগ্রহের পরিধি আরো বেড়ে গেছে। অর্থনীতি, রাজনীতি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ইত্যাদির প্রতি অনেক আগ্রহ বোধ করতাম। বিশেষ করে বিজ্ঞানের প্রতি। অণু-পরমাণু কিভাবে কাজ করে, পৃথিবীর সৃষ্টি হলো কিভাবে, প্রাণ এর সৃষ্টি হলো কিভাবে, প্লেইন কিভাবে আকাশে উড়ে, কম্পিউটার কিভাবে কাজ করে – এরকম রাজ্যের প্রশ্ন আমার মাথায় খেলা করতো তখন। নটর ডেম এ পরিচয় হয় আমার বন্ধু তানভীর এর সাথে। বিজ্ঞান এর বিভিন্ন ব্যাপারে ওর ছিলো অনেক জ্ঞ্যান। ওর সাথে কতো যে তর্ক বিতর্ক করেছি বিজ্ঞ্যানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে! তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের ভেতর
ফুলার রোডে ছিলো ব্রিটিশ কাউন্সিল এর লাইব্রেরী। ওখানে সদস্য হলে বিভিন্ন ধরণের বই আনতে পারা যায়, এটা শোনার পর দেরী না করে সদস্য হয়ে যাই। এরপর কতো যে বই এনেছি ওখান থেকে! যে বইটি বিশেষভাবে আমার এখনো মনে আছে সেটার নাম হলো “প্ল্যানেট আর্থ”, লেখকের নাম সিজার এমিলিয়ানি। এই বইটি আমার জীবনকে অনেকটাই বদলে দিয়েছিলো। বইটির বিষয়বস্তু ছিলো অনেক ব্যাপক – বিশ্বজগতের সৃষ্টি, প্রাণের সৃষ্টি, পৃথিবীর জন্ম থেকে আজ পর্যন্ত চার বিলিয়নেরও বেশি সময়ের ভূতাত্বিক ইতিহাস, ইত্যাদি। এইসব বইপত্র পড়ে পড়ে আর সেগুলো নিয়ে ভাবতে ভাবতে আমি বড় হলে বিজ্ঞানী হওয়ার কথা ভাবতাম। পদার্থবিজ্ঞান আমাকে খুব
টানতো। কোয়ান্টাম মেকানিক্স এর বিচিত্র জগৎ, কসমোলজির অবিশ্বাস্য ঘটনাপ্রবাহ, রিলেটিভিটি’র “আপেক্ষিক সত্য” – এসবকিছুর কারণে আমি মোটামুটি নিশ্চিত ছিলাম বড় হলে একজন পদার্থবিজ্ঞানীই হবো।

আইডিয়ালে (আমার হাই স্কুল) থাকতেই আমার আরেকটা স্বপ্ন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিলো ধীরে ধীরে। সেই স্বপ্নের নাম হলো “আমেরিকা”! সেই ছোটবেলা থেকে মনে হয় এমন কোন দিন যেতো না যেদিন কোন না কোন ব্যাপারে আমেরিকা’র নামটা শুনিনি। পত্র-পত্রিকা, টেলিভিশন সংবাদ, টেলিভিশন সিনেমা, ভিসিআর এর সিনেমা, তিন গোয়েন্দা, মাসুদ রানা, এফবিআই-সিআইএ, ম্যাডোনা, মাইকেল জ্যাকসন, হলিউড, টারমিনেটর টু, বেসিক ইন্সটিঙ্কট, বিজ্ঞান-প্রযুক্তির যতো আবিষ্কার, হার্ভার্ড-এমআইটি, নাসা, সারা পৃথিবী জুড়ে যতো যুদ্ধ-বিগ্রহ – সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু ছিলো এই আমেরিকা। আমেরিকা ক্রমেই ঢুকে যাচ্ছিলো আমার উৎসুক মনের গভীরে। আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম প্রচন্ডভাবে। এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হতে না হতেই ছুটলাম মতিঝিলের ইউসিস অফিসে। সেখান থেকে আমেরকার যতো বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠিকানা নিয়ে ভর্তির জন্য এপ্লাই করলাম। ভর্তির অফারও পেলাম কয়েকটি থেকে। ভিসা’র জন্য দাঁড়ালাম ঢাকার বনানীর সবচেয়ে বড় লাল দালানটিতে – স্বপ্নের দেশের এম্ব্যাসিতে। তখন ভিসা নিয়ে ছিলো ভয়াবহ রকমের কড়াকড়ি। যথারীতি ভিসা পাইনি। তিনবার দাঁড়ানোর পর রণে ভঙ দিলাম। কিন্তু আমেরিকা যাবার স্বপ্ন তাতে এতোটকু কমেনি!

শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার শুরু হলো এক নতুন জীবন। সেখানে ছিলেন আমার স্বপ্নের মানুষ – মুহম্মদ জাফর ইকবাল। আমার জীবন যে কয়জন মানুষ দ্বারা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছে তাদের মধ্যে একেবারে প্রথম সারিতে আছে জাফর স্যারের নাম। মাঝে মাঝে যখন খুব বেশি মন খারাপ থাকে, নিরাশ হয়ে থাকি, জীবনের কোন মানে খুঁজে পাই না, তখন একটা কথা ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দিই – জাফর স্যারের মতো মানুষেরা যখন বেঁচে আছে তখন বেঁচে থাকার নিশ্চয়ই কিছু একটা অর্থ আছে!

বিশ্ববিদ্যালয়ে এসিএম প্রোগ্রামিং করতাম। কম্পিউটার দিয়ে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করা। খুবই আনন্দদায়ক একটা ব্যাপার ছিলো এই প্রবলেম সলভিং। প্রোগ্রামিং করতে করতে স্বপ্ন দেখতাম একদিন খুব বড় প্রোগ্রামার হবো, খুব বড় প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানীতে পৃথিবী বদলে দেওয়া যায় এমন সব কম্পিউটিং প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করবো। কখনো বা হ্যাকার হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। জটিল সব ভাইরাস লিখে বড় বড় কম্পিউটার এর নিরাপত্তা ভেঙ্গে সেখানের সব তথ্য বের করে ফেলবো আর সবাই আমার প্রোগ্রামিং দক্ষতার প্রশংসা করবে!

আরো একটা স্বপ্ন ছিলো বিশেষ করে কলেজ জীবন থেকে – দেশের জন্য কিছু একটা করা। সেই ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি জ্বালাও-পোড়াও, ভাংচুর, হরতাল-অবরোধ, হত্যা-প্রতিহত্যার রাজনীতি, ঘুষ, অনিয়ম, ট্রাফিক জ্যাম, পানি-বিদ্যুতের অভাব – আরো কতো কী! কলেজ-বিশ্ববিদ্যালগুলোতে পড়ালেখা ছাড়া আর যা যা করা যায় তার সবকিছুই চলে অবিরাম। খুব ইচ্ছে হয় দেশের জন্য কিছু একটা করতে। আমি আর আমার বন্ধু রাজু কমলাপুর রেল স্টেশনের কাছে রেল লাইনের উপর বসে বসে কতো বিকেল পার করেছি দেশের জন্য স্বপ্ন দেখে দেখে! কতো প্ল্যান করেছি কিভাবে দেশের জন্য কিছু করা যায়। একটা খুব ভালো বিশ্ববিদ্যালয় বানাবো যার উপাচার্য হবেন জাফর স্যার। সেই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যেসব ছেলেমেয়েরা বের হবে তারা একেকজন হবে একেকটা বারুদের মতো। অসম্ভব সেই প্রতিভাবান ছেলেমেয়েরা কেউ হবে বিজ্ঞানী, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেই ডাক্তার, কেউ আর্কিটেক্ট, কেউ দেশের প্রতি পরম মমতাসম্পন্ন রাজনীতিবিদ, কেউ ভবিষ্যৎ নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ, কেউ বিখাত গণিতবিদ… ভাবতাম বড় হয়ে রাজনীতি করবো। একদিন এই দেশের সরকার প্রধান হবো আর বদলে দিবো দেশটাকে…

স্বপ্ন আর পরিকল্পনার এখনো শেষ নেই। কতো নতুন নতুন স্বপ্ন দেখি, কতো কিছু করতে চাই, কতো কিছু পেতে চাই এই জীবনে। এক জীবনে মানুষ কতো বছর বাঁচে? সত্তর, আশি, নব্বই, কিংবা বড়জোর একশ বছর? এই সময়ের মধ্যে কি সব কিছু পাওয়া যায়? প্রজাপতির মতো আমাদের মন খালি উড়ে বেড়ায়। কতো স্বপ্ন পূরণ হয়, কতো চাওয়া পূরণ হয়, তবু কি স্বপ্নগুলো থেমে থাকে? আমাদের চাহিদা কি কখনো কমে আসে?

সবকিছুর শেষে এই স্বপ্নগুলোই, চাওয়াগুলিই আমাদের জীবনটাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। প্রজাপতি মন-ই আমাদের জীবনের সম্পুর্নতার দিকে টেনে নিতে থাকে। জীবন চলতে থাকে…

Be Happy in a Few Simple Steps!

I recently read this beautifully written essay on how to be happy and live a satisfying life. Loved it so much that I thought of republishing it on my site. Luckily I have permission to reprint it under the Creative Commons Attribution- Noncommercial- No Derivative Works 3.0 United States License. The name of the writer is Michael Montoure.

Here it is:

You can be happy. You can live the life you want to live. You can become the person you want to be.

This is what I’ve figured out so far.

Stop assigning blame. This is the first step. Stop assigning blame and leave the past behind you.

You know whose fault it is that your life isn’t perfect. Your boss. Your teachers. Your ex-lovers. The ones who hurt you, the ones who abused you, the ones who left you bleeding. Or even yourself. You know whose fault it is — you’ve been telling yourself your whole life. Knowing whose fault it is that your life sucks is an excellent way to absolve yourself of any reponsibility for taking your life into your own hands.

Forget about it. Let it go. The past isn’t real. “That was in another country, and besides, the wench is dead.” If we’re not talking about something that is real and present and in your life right now, then it doesn’t matter. Nothing can be done about it. If nothing can be done about it, then don’t spend your energy dwelling on it — you have other things to do.

I may sound cruel, I may sound simplistic, I may sound like I’m saying you should just “get over it,” by suggesting that you should let go of your past. I’m sorry for that. But life won’t hold still and wait for you to lick your wounds. The race is still being run. Get up and keep moving. You can’t do anything about yesterday.

You can do something about tomorrow. And about the next day. Focus your energies there.

“I don’t have time to write.” “I can’t dance.” “I can’t talk to new people.” “I’m not attractive.”

I hear this all the time. I always hear the people around me sabotaging themselves, drawing lines and borders and boxes around themselves.

To which I say, make the time; dance; just talk to people; be attractive!

Yes, again, it’s simplistic of me to say that. But it’s simplistic of you to so easily say what you cannot do!

We’re excellent pattern-matchers. That’s what the human mind does — it’s a pattern-matching engine. So we look at ourselves, at our history, at our behaviors, and we draw straight lines between the points — we assume that just because we’ve done things a certain way in the past, we’ll always do them that way in the future. If we’ve failed before, we’ll always fail.

Screw that.

Surprise yourself. No — amaze yourself.

You don’t have to keep doing the things you hate. Why go home and beat yourself up for, say, not going over and saying a few words to someone you find really attractive? Can any damage they could do to you by rejecting you possibly be any worse than the damage you’re going to do to yourself for missing the chance?

Find the demon.

Do you know what I’m talking about? It’s the little voice in the back of your head that’s always whispering, “You can’t.” You know the demon. You may think you hate the demon, but you don’t. You love it. You let it own you. You do everything it says. Everytime there’s something you want, you consult the demon first, to see if it will say, “You can’t have that.”

What you don’t realize is that your demon doesn’t know anything. It’s an idiot. It’s nothing but a parrot, repeating back to you anything negative that it’s ever heard, anything that makes you hurt, makes you squirm. If a teacher once told you “You’ll never accomplish anything,” it was listening; it hoards words like that and repeats them back to you to watch you jump. It doesn’t know what it’s saying. It doesn’t care.

Exorcise yourself.

You can take me literally or not, as suits you. But do, please, the next time you hear that voice in your head, imagine it, visualize it, as something physical that you can get hold of; tear it out of you, feel its fingers weaken and lose their grip on your spine, and grind it to dust, to nothing, under your boot heel on your way out to dance in the streets.

You can. You think you can’t; but it’s telling you that. You can.

You don’t exist.

You just think you do.

We’re nothing but the stories we tell ourselves. We know in our hearts what kind of people we are, what we’re capable of, because we’ve told ourselves what kind of people we are. You’re a carefully-rehearsed list of weaknesses and strengths you’ve told yourself you have.

(Self-confidence, for example, is a particularly nebulous quality you can easily talk yourself out of having.)

You owe no allegiance to that self-image if it harms you. If you don’t like the story your life has become — tell yourself a better one.

Think about the person you want to be and do what that person would do. Act the way that person would act.

Amazingly enough, once you start acting like that person, people will start treating you like that person.

And you’ll start to believe it. And then it will be true.

Welcome to your new self.

You are a product of your environnent.

Most people realize this — usually, in the form of having something else to blame — but they tend to forget one important fact:

Humans are the masters of changing their environment.

What this means is that if your environment affects you, and you can affect your environment, then obviously, you can affect yourself.

  • Your environment includes people. Figure out who in your life isn’t good for you, whose presence tears you down more than it builds you up, whose nearness is poison to you — and get rid of them. Get them out of your life. I don’t care if it’s your best friend, your boss, your mother, your lover — if they are harming you, if they are doing nothing but reinforce everything bad you tell yourself about yourself, then your relationship with them needs to radically alter or it needs to end.
  • Your environment includes goals. Don’t set yourself pie-in-the-sky impossible goals and then beat yourself up over not achieving them — set yourself goals that will be good for you, not a source of pain. Attainable goals. Set them and meet them. Don’t tell yourself you can’t — that’s the old story, that story you used to tell yourself about what a poor sad victim you were and how you could never change anything about your life. You can meet your goals. This is the new story.Trying to clean your house? Good for you — a clean house can really affect your state of mind for the better. But don’t say “Today I’m going to clean the entire house from top to bottom,” when you don’t have the time and energy to — don’t set yourself up for failure; don’t feed the demon. Just say, “Today I’m going to wash all the dishes and clean off the kitchen counter.” And do it.Don’t tell yourself, “This month I’m going to write that novel.” Tell yourself, “Today I’m going to write five pages.” And do it. Take your dreams and break them down into small pieces and you’ll have them in your hands before you know it.

    And you’ll find, as you start meeting your goals, that you like it. That it feels good, makes you feel confident and capable. You’ll develop a hunger for it.

  • Your environment includes yourself — your physical presence. Do what you know you need to do — treat yourself better. Sleep, eat right, exercise. This doesn’t mean you have to stop staying out late at night now and then, it doesn’t mean you can’t have a candy bar, it doesn’t mean you have to stop sitting around watching television — it just means start doing the things that are good for you as well as the things that are bad for you, every so often. It’s not an all-or-nothing proposition; you don’t have to devote your life to being a health nut. Just try eating more fruits and vegetables, the occasional vegetarian meal; go for walks in the park on the weekends. You’ll feel better and be more alert if you’re a little healthier, and once you start feeling a little better, you’ll start wanting the things that make you feel better. You’ll see.
  • Your environment includes your appearance. If you’re not happy with yourself, if you’re angry with the person in the mirror, it can honestly help to literally change who you see when you look in the mirror. Try a different hairstyle, new glasses, new jewelry, new clothes. It doesn’t have to be expensive — there’s a whole universe full of possible You’s waiting to be found in thrift stores, if need be. If you’re deciding to become the person you want to be, then decide what that person is going to look like. Dress the part. It’s not shallow, it’s not about vanity, it’s about self-transformation — even the most primitive tribes understand the value of costumes and masks for ritual, for change, for becoming someone else.

You are not an object. You are a system. Like with any system, if you change the inputs — change what goes into it — you’ll change what comes out.

Despite everything I’ve just said:

Self-examination can be paralysis.

Don’t “remember to breathe” — just breathe. It’s a Tao thing.

It’s the paradox at the center of all this — remember that, “Am I living up to being the person I want to be?”, is not a question the person you want to be would ask.

If I can leave you with just one thought, it’s this:

Stop wasting your time fretting over not being happy.

Just be happy.

Michael Montoure is a writer and a web developer living in the Pacific Northwest.

(reprinted under Creative Commons Attribution- Noncommercial- No Derivative Works 3.0 United States License.)

Next Page »